যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই কূটনৈতিক আলোচনার নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) তার বিশেষ প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছেন এই আলোচনায় অংশ নিতে।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট (Karoline Leavitt) বুধবার (৮ এপ্রিল) এক ব্রিফিংয়ে জানান, এই প্রতিনিধিদলে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance), ট্রাম্পের উপদেষ্টা স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার। পাকিস্তানের স্থানীয় সময় শনিবার সকালে এই গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হবে বলে তিনি জানান।
লেভিট বলেন, “আমরা এই সরাসরি বৈঠকগুলোর দিকে তাকিয়ে আছি।” অন্যদিকে, বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইসলামাবাদে মার্কিন প্রতিনিধিদল ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি (Abbas Araghchi)-এর সঙ্গে বৈঠক করতে পারে।
যুদ্ধবিরতির পেছনের কূটনীতি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের ভূমিকা ‘অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ’ বলে উল্লেখ করেন লেভিট। তিনি বলেন, শুরু থেকেই ভ্যান্স এই আলোচনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এখন সরাসরি অংশ নিতে ইসলামাবাদ যাচ্ছেন।
এদিকে একই দিনে ন্যাটো (NATO)-এর সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও নতুন করে আলোচনার ইঙ্গিত দিয়েছেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধে প্রত্যাশিত সমর্থন না পাওয়ায় জোটটির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটের সঙ্গে বৈঠকে এই বিষয়টি উঠে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যুদ্ধবিরতির শর্ত নিয়েও তৈরি হয়েছে বিভ্রান্তি। ইরান তাদের ঘোষিত ১০ দফা শর্ত প্রকাশ করলেও, এক মার্কিন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্তে সম্মত হয়নি। বরং ভিন্ন শর্তে সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
ইরানের পক্ষ থেকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহারে নতুন কঠোর নিয়ম আরোপ করা হয়েছে। কোনো জাহাজ অনুমতি ছাড়া এই জলপথ অতিক্রমের চেষ্টা করলে তা ধ্বংস করা হবে বলে সতর্ক করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রতিটি জাহাজকে কার্গো সংক্রান্ত তথ্য আগে ই-মেইলে জানাতে হবে এবং প্রতি ব্যারেল তেলের জন্য এক ডলার হারে টোল দিতে হবে, যা পরিশোধ করতে হবে ক্রিপ্টোকারেন্সিতে।
ইরানের তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্য রপ্তানিকারক ইউনিয়নের মুখপাত্র হামিদ হোসেইনি বলেন, এই নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্য হচ্ছে যুদ্ধবিরতির সময় অস্ত্র পরিবহন ঠেকানো এবং প্রণালির ওপর নজরদারি জোরদার করা। তবে এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ হবে বলেও তিনি জানান।
এই পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কঠোর অবস্থান যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। ট্রাম্পও স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব অনেকটাই নির্ভর করছে ইরান প্রণালিটি নিরাপদ ও উন্মুক্ত রাখতে রাজি কি না তার ওপর।
বর্তমানে বিশ্ববাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে জাহাজ চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশ্বের বড় শিপিং কোম্পানিগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং অনেকে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি টিকে থাকলেও জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে সময় লাগবে। একই সঙ্গে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো হরমুজে ইরানের নিয়ন্ত্রণ মেনে নেবে কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের আসন্ন বৈঠককে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মোড় হিসেবে দেখছেন, যা পরিস্থিতি শান্ত করার সুযোগ তৈরি করতে পারে—অথবা নতুন সংঘাতের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।


