সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়নে ‘১২ কোটি টাকার প্রস্তাব’—ফাতেমা বাদশার অভিযোগে চট্টগ্রামে তোলপাড়

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে নতুন করে আলোড়ন তৈরি হয়েছে জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ফাতেমা বাদশা (Fatema Badsha)-র বিস্ফোরক অভিযোগে। ঢাকাভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক টাইমস অব বাংলাদেশ (Times of Bangladesh)-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেছেন, সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন নিশ্চিত করতে তাঁর কাছে ১২ কোটি টাকা দাবি করা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম নগরের ডবলমুরিং থানা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত বাদশা মিয়ার স্ত্রী ফাতেমা বাদশা বলেন, ঢাকা থেকে একটি দল মাইক্রোবাসে করে চট্টগ্রামে এসে সরাসরি তাঁর সঙ্গে দেখা করে। ওই বৈঠকে তাঁকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়—১২ কোটি টাকা দিলে সংরক্ষিত নারী আসনে মনোনয়ন এবং পরে সংসদ সদস্য হওয়া নিশ্চিত করা হবে।

তবে এখানেই প্রস্তাব শেষ হয়নি বলে দাবি তাঁর। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে আরেকটি বিকল্প পথ দেখানো হয়। ফাতেমা বাদশার ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁকে বলা হয়—তিনি এমপি হতে পারবেন, তবে আগে থেকেই কিছু নথিতে স্বাক্ষর করে দিতে হবে। ওই নথির মাধ্যমে তাঁর নামে বরাদ্দ হওয়া উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারের অনুমোদন থাকবে, কিন্তু প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ থাকবে একটি গোষ্ঠীর হাতে।

তিনি বলেন, ‘তাহলে আমি পুতুল ছাড়া কিছুই থাকতাম না। আমার হাত-পা বাঁধা থাকত। রাজনীতিতে আসার উদ্দেশ্য এটা নয়।’ তিনি জানান, দুই প্রস্তাবই তিনি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

প্রায় চার দশক ধরে রাজনীতিতে সক্রিয় ফাতেমা বাদশা চট্টগ্রাম (Chattogram)-৯ (কোতোয়ালি-বাকলিয়া) আসন থেকে বিএনপি (BNP)-র মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তিনি জানান, চট্টগ্রাম বিভাগের আটটি জেলায় নিয়মিত সফর করেছেন এবং নিজের অর্থ খরচ করে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে কাজ করেছেন। তাঁর কথায়, ‘কোনো ব্যক্তিগত লাভের আশায় কাজ করিনি। কিন্তু আজ সেই ত্যাগের কোনো স্বীকৃতি নেই।’

একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার কথাও সামনে আনেন তিনি। তাঁর দাবি, একটি ‘অদৃশ্য শক্তি’ দীর্ঘদিন ধরে দলীয় স্বীকৃতি পাওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি বলেন, ‘কারা তারা, জানি না। কিন্তু সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে। যোগ্যতা ও নিষ্ঠার আর কোনো মূল্য নেই।’

যারা তাঁর কাছে এই প্রস্তাব নিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের নাম-পরিচয় ও ফোন নম্বর তাঁর কাছে আছে বলেও দাবি করেছেন ফাতেমা বাদশা। তবে তিনি এখনই সেসব প্রকাশ করতে রাজি হননি। ফলে অভিযোগটি স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি টাইমস অব বাংলাদেশ।

দলীয় কাঠামোর ভেতরে আরেকটি প্রবণতার দিকেও ইঙ্গিত করেন তিনি। চট্টগ্রামের রাজনীতিতে বাইরের জেলার নেতাদের প্রভাব বাড়ছে বলে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘অন্য জেলা থেকে লোক এনে যদি চট্টগ্রাম চালানো হয়, তাহলে স্থানীয় নেতাদের ভূমিকা কোথায়?’

অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পরও চট্টগ্রামে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা দেখা যায়নি। অভ্যন্তরীণ তদন্তের ইঙ্গিতও মেলেনি।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ (Ershad Ullah) বলেন, তিনি এ বিষয়ে কিছু জানেন না। বর্তমানে ওমরাহ পালনের জন্য সৌদি আরবে অবস্থান করছেন তিনি।

মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব নাজিমুর রহমান (Nazimur Rahman) বলেন, ‘এ বিষয়ে আমার কোনো তথ্য নেই। কেউ আমার কাছে এ ধরনের কিছু নিয়ে আসেনি।’ একই সঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, দায়িত্বশীল পদে থাকা কারও এভাবে প্রকাশ্যে অভিযোগ তোলা কতটা সমীচীন। অভিযোগের আর্থিক দিক নিয়েও সংশয় প্রকাশ করে তিনি বলেন, একজন সংসদ সদস্যের সরকারি আয়ে এমন বড় বিনিয়োগের বাস্তবতা নেই।

অন্যদিকে, বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তাঁর ভাষায়, বিষয়টি তাঁর দায়িত্বের আওতায় পড়ে না।

সংরক্ষিত নারী আসন ঘিরে এবার তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে। ৫০টি সংরক্ষিত নারী আসনের মধ্যে বিএনপি পাচ্ছে ৩৬টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে ২ বা ৩ জন মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক প্রার্থী সক্রিয় তৎপরতা চালাচ্ছেন। সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচন আগামী ১২ মে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।