মানবাধিকার কমিশনের পদত্যাগের পর ‘আইনি অনিশ্চয়তা’ নিয়ে উদ্বেগ, খোলা চিঠিতে তীব্র প্রতিক্রিয়া

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সব সদস্য একযোগে পদত্যাগের পর নতুন আইনি পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিদায়ী চেয়ারম্যান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী (Moinul Islam Chowdhury) ও অন্যান্য কমিশনাররা। তাদের স্বাক্ষরিত এক খোলা চিঠিতে সাম্প্রতিক আইন পরিবর্তনের প্রভাব এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

চিঠিতে চেয়ারম্যান ছাড়াও সদস্য নুর খান, ইলিরা দেওয়ান, মো. শরিফুল ইসলাম ও নাবিলা ইদ্রিসের স্বাক্ষর রয়েছে। এর আগে জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন (রহিতকরণ ও পুনঃপ্রচলন) বিল’ কণ্ঠভোটে পাস হয়, যার ফলে ২০০৯ সালের পুরোনো আইন পুনর্বহাল এবং সাম্প্রতিক অধ্যাদেশগুলো বাতিল হয়ে যায়।

এই সিদ্ধান্তের ফলে ভুক্তভোগীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, অনেকেই প্রশ্ন করছেন—“এখন আমাদের কী হবে?” এই দায়বদ্ধতা থেকেই কমিশনের পক্ষ থেকে বিষয়গুলো জনসম্মুখে তুলে ধরা হয়েছে।

চিঠিটি তিনটি প্রধান অংশে বিভক্ত—সংসদে উপস্থাপিত ভুল তথ্যের জবাব, অধ্যাদেশ বাতিলের প্রকৃত কারণ বিশ্লেষণ এবং ভবিষ্যৎ আইনের মানোন্নয়ন নিয়ে প্রস্তাবনা।

প্রথমত, সংসদে বলা হয়েছিল গুমের শাস্তি মাত্র ১০ বছর, যা ভুক্তভোগীদের জন্য অবিচার। তবে চিঠিতে দাবি করা হয়, বাস্তবে গুম অধ্যাদেশে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী সর্বোচ্চ সাজা মৃ’\ত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডসহ বিভিন্ন মেয়াদের শাস্তি এবং জরিমানার বিধান রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, তদন্তের সময়সীমা ও জরিমানা নির্ধারণে কোনো স্পষ্টতা নেই—এমন অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। কমিশনের দাবি, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশে তদন্তের সময়সীমা নির্ধারিত এবং জরিমানা আদায়ের বিস্তারিত পদ্ধতি উল্লেখ আছে। বরং পুনর্বহালকৃত ২০০৯ সালের আইনে এসব বিষয় অনুপস্থিত।

তৃতীয়ত, সংসদে বলা হয় আইসিটি আইনই যথেষ্ট এবং নতুন অধ্যাদেশগুলো অপ্রয়োজনীয়। কিন্তু চিঠিতে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, আইসিটি আইন কেবল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারে, বিচ্ছিন্ন গুমের মতো ফৌজদারি অপরাধের ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য নয়। ফলে অধ্যাদেশ বাতিলের পর নতুন গুমের ঘটনায় আইনি প্রতিকার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

চতুর্থত, জুলাই যোদ্ধাদের সুরক্ষার বিষয়েও বিভ্রান্তি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে বলা হয়, নতুন আইনের ফলে মানবাধিকার কমিশনের তদন্তক্ষমতা সীমিত হয়ে গেছে, বিশেষ করে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে। এতে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক কর্মীদের ঝুঁকি বাড়তে পারে।

সবশেষে কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতের অভিযোগ নিয়েও জবাব দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, কোনো অপরাধ গুরুতর হলে কমিশনের মামলা করার সুযোগ থাকা স্বাভাবিক এবং এটি বিচারিক পক্ষপাত সৃষ্টি করে না, কারণ কমিশন নিজে বিচারক হিসেবে কাজ করে না।

এই খোলা চিঠি প্রকাশের পর আইন, মানবাধিকার ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধ্যাদেশ বাতিল ও পুরোনো আইন পুনর্বহালের ফলে মানবাধিকার সুরক্ষা কাঠামো নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।