গ্রীষ্মেই ফিরতে পারে শক্তিশালী ‘এল নিনো’, বাড়তে পারে বৈশ্বিক তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি

চলতি গ্রীষ্মে আবারও শক্তিশালী এল নিনো (El Niño) ফিরে আসতে পারে—এমন আশঙ্কা জানাচ্ছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এটি ‘সুপার এল নিনো’-তেও রূপ নিতে পারে। এমনটি হলে আগামী বছর বিশ্ব তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড ছুঁতে পারে। পাশাপাশি ঝড়, খরা, বন্যা ও চরম আবহাওয়াজনিত দুর্যোগের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় অস্বাভাবিক উষ্ণ হয়ে ওঠার একটি জলবায়ুগত ঘটনা। সাধারণত সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অন্তত ০.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হলে এই পরিস্থিতিকে এল নিনো বলা হয়। এর প্রভাব শুধু মহাসাগরে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং বিশ্বজুড়ে বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা ও মৌসুমি আচরণে বড় পরিবর্তন আনে।

মার্কিন ক্লাইমেট প্রেডিকশন সেন্টার (Climate Prediction Center) জানিয়েছে, এই গ্রীষ্মে এল নিনো তৈরির সম্ভাবনা ৬২ শতাংশ। ‘সুপার এল নিনো’ বলতে বোঝানো হয়, যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অন্তত ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি হয়ে যায়। ১৯৫০ সালের পর এমন ঘটনা খুব কমবারই দেখা গেছে।

আলবানি বিশ্ববিদ্যালয় (University at Albany)-এর অধ্যাপক ড. পল রাউন্ডি সতর্ক করে বলেছেন, ১৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনো ঘটনার বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে। মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয় (University of Miami)-এর ড. অ্যান্ডি হেজেলটনও বলেছেন, বিভিন্ন মডেল ও পর্যবেক্ষণ একই ইঙ্গিত দিচ্ছে—এটি অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হতে পারে এবং চলতি বছর বৈশ্বিক জলবায়ুতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

ক্লাইমেট সেন্ট্রাল (Climate Central)-এর জলবায়ু বিজ্ঞানী টম ডি লিবার্টো অবশ্য বলেছেন, বিষয়টি এখনো নিশ্চিত নয়। তবে এল নিনোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব উপাদান এখন বিদ্যমান। তার মতে, ঝুঁকি এতটাই বেশি যে এখন থেকেই উদ্বিগ্ন হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হতে পারে। অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চল, ভারত এবং দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশে খরা, দাবদাহ ও পানিসংকট বাড়তে পারে। অ্যামাজন বনাঞ্চলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যপ্রাচ্যের কিছু এলাকা এবং দক্ষিণ-মধ্য এশিয়ায় অতিভারি বৃষ্টিপাত হতে পারে।

২০১৫ সালের সুপার এল নিনোর সময় ইথিওপিয়ায় ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছিল। পুয়ের্তো রিকোতে তৈরি হয়েছিল তীব্র পানিসংকট। উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরে দেখা গিয়েছিল অস্বাভাবিকভাবে শক্তিশালী হ্যারিকেন মৌসুম। সেই অভিজ্ঞতা এবারও নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় (University of Colorado)-এর ড. জোয়েল লিসনবি বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বড় ধাক্কা এলেই খরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে যাবে—এমন ধারণা ভুল। তার ভাষায়, খরা কাটাতে হলে অসাধারণ মাত্রার বৃষ্টিপাত দরকার, আর তা হলে বন্যা, ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রা’\ণহানির ঝুঁকিও বাড়বে।

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (WMO)-এর মহাসচিব সেলেস্ট সাউলো বলেছেন, ২০২৩-২৪ সালের সর্বশেষ এল নিনো রেকর্ডের শীর্ষ পাঁচটির একটি ছিল এবং ২০২৪ সালের রেকর্ড বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি বলেন, এল নিনো ও লা নিনার মৌসুমি পূর্বাভাস কৃষি, স্বাস্থ্য, জ্বালানি, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতি কমানো, মানবিক সংকট মোকাবিলা এবং বহু জীবন রক্ষা করা সম্ভব।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হবে। তবে এখনই প্রস্তুতি না নিলে, পরবর্তী ধাক্কা আরও কঠিন হতে পারে।