কাশ্মীরে নজিরবিহীন মানবিক উদ্যোগ: ইরানের মানুষের পাশে দাঁড়াতে স্বর্ণ-সঞ্চয় উজাড়

ইরানের জনগণের প্রতি সহমর্মিতা জানাতে এক অনন্য মানবিক উদ্যোগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে কাশ্মীর (Kashmir) অঞ্চলের মানুষ। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্ত ইরানি বেসামরিক নাগরিকদের সহায়তায় বহু কাশ্মীরি তাদের সঞ্চিত সম্পদ, এমনকি অতি মূল্যবান স্বর্ণের গয়নাও দান করছেন।

শুধু গয়না নয়, বছরের পর বছর ধরে মাটির ব্যাংকে জমিয়ে রাখা অর্থও তুলে দিচ্ছেন তারা। স্থানীয় সূত্র জানাচ্ছে, এ পর্যন্ত সংগৃহীত সহায়তার পরিমাণ ৬০০ কোটি রুপিরও বেশি ছাড়িয়েছে।

শ্রীনগর (Srinagar) থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আল জাজিরা (Al Jazeera) জানায়, চলতি বছরের ২১ মার্চ ঈদুল ফিতরের দিন কেন্দ্রীয় কাশ্মীরের বুদগামের ৫৫ বছর বয়সী মাসরাত মুখতার তার বাবার দেওয়া জন্মদিনের উপহার—এক জোড়া স্বর্ণের কানের দুল—ইরানের মানুষের জন্য দান করেন। শুধু তিনি নন, তার আত্মীয়স্বজনও নিজেদের মূল্যবান জিনিসপত্র নিয়ে এগিয়ে আসেন।

ঈদের মতো আনন্দঘন দিনে নিজেদের উৎসবের রীতি-নীতি অনেকটাই স্থগিত রেখে ১৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে থাকা ইরানের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে কাশ্মীরের পরিবারগুলো। নগদ অর্থ, গৃহস্থালির সামগ্রী, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পদও তারা ত্রাণ তহবিলে জমা দিচ্ছেন। কোথাও তামার বাসন, কোথাও গবাদিপশু, আবার কোথাও সাইকেল কিংবা সঞ্চয়ের অর্থ তুলে দেওয়া হয়েছে। শিশুরাও তাদের মাটির ব্যাংক ভেঙে দিয়েছে। দোকানদার ও ব্যবসায়ীরা নিজেদের আয়ের অংশ দান করেছেন।

মাসরাত মুখতার বলেন, “আমরা যা ভালোবাসি, তাই দেই। এতে আমরা তাদের আরও কাছাকাছি অনুভব করি। এই ছোট ইরান তার নামের প্রতি এভাবেই দায়িত্ব পালন করে।” তার এই কথায় ধরা পড়ে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও আবেগঘন সম্পর্কের প্রতিফলন।

এই সম্পর্কের শিকড় ছড়িয়ে আছে শতাব্দীর পর শতাব্দীজুড়ে। শ্রীনগরের শিয়া অধ্যুষিত জাদিবাল এলাকার বাসিন্দা ৭৩ বছর বয়সী তাহেরা জান জানান, কাশ্মীরে মেয়েদের বিয়ের জন্য তামার বাসন জমিয়ে রাখার একটি ঐতিহ্য রয়েছে। কিন্তু এবার সেই ঐতিহ্য ভেঙে সেগুলো দান করা হয়েছে ইরানের ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য।

২৪ বছর বয়সী ট্রাকচালক সাদাকাত আলি মীর তার জীবিকার অন্যতম মাধ্যম—দুটি গাড়ির একটি—দান করেছেন। অন্যদিকে, নয় বছর বয়সী জয়নাব জানসহ শিশুরাও তাদের সঞ্চিত অর্থ তুলে দিয়েছে। কেউ সাইকেল, কেউ স্কুটার, কেউ আবার প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি সামগ্রী দিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, কাশ্মীরে শিয়া মুসলিমদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতির কারণে ইরানের পরিস্থিতি সেখানে গভীরভাবে প্রতিফলিত হয়। তবে এই উদ্যোগে শুধু শিয়া নয়, সুন্নি মুসলিমরাও অংশ নিয়েছেন সমানভাবে। অনেকেই ঈদ উদযাপন সীমিত করে সেই অর্থ ইরানের জন্য দিয়েছেন। দোকানপাট আগেভাগে বন্ধ করে দিয়ে, দৈনন্দিন খরচ কমিয়ে এই সহায়তা তহবিল গড়ে তুলেছেন তারা।

রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিরাও এই মানবিক উদ্যোগে শামিল হয়েছেন। বুদগামের আইনপ্রণেতা আগা সৈয়দ মুনতাজির মেহেদী তার এক মাসের বেতন ত্রাণ তহবিলে দান করেছেন। শুধু কাশ্মীর নয়, পাকিস্তান, ইরাকসহ আরও বিভিন্ন দেশ থেকেও ইরানের পক্ষে সহায়তার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

কোটি কোটি টাকার সহায়তা

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, কাশ্মীর থেকে সংগৃহীত সহায়তার পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি রুপি, যা প্রায় ৬৪ মিলিয়ন ডলারের সমান। এই সহায়তার মধ্যে রয়েছে নগদ অর্থ, স্বর্ণ, গয়না, গৃহস্থালি সামগ্রী, গবাদিপশু এবং যানবাহন। শ্রীনগর, বুদগাম, বারামুল্লা ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় স্থাপিত সংগ্রহকেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবীরা এসব সহায়তার হিসাব রাখছেন। চিকিৎসকরা প্রস্তুত করছেন মেডিকেল কিট, আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

নয়াদিল্লি (New Delhi)-তে অবস্থিত ইরানের দূতাবাস কাশ্মীরের জনগণের এই উদ্যোগকে গভীর কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকৃতি দিয়েছে। এক বিবৃতিতে তারা জানায়, “কাশ্মীরের দয়ালু জনগণ তাদের মানবিক সহায়তা ও আন্তরিক সংহতির মাধ্যমে ইরানের জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছে—এই উদারতা চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে।”

দূতাবাসের শেয়ার করা এক ভিডিওতে দেখা যায়, এক বিধবা নারী তার প্রয়াত স্বামীর স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রাখা স্বর্ণ দান করছেন। যদিও পরে সেই পোস্টটি সরিয়ে নেওয়া হয়, তবুও পরবর্তীতে ভারত ও কাশ্মীরের জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে আবার বার্তা প্রকাশ করা হয়। দূতাবাস আরও উল্লেখ করে, ভারত থেকে পাওয়া অনুদানের একটি বড় অংশই এসেছে কাশ্মীর থেকে।