শহরের বাইরে বাড়ছে লোডশেডিং, গরমে জনজীবন অতিষ্ঠ: বিদ্যুৎ ঘাটতি নিয়ে নতুন শঙ্কা

এপ্রিলের শুরুতে বৃষ্টি আর ঝোড়ো হাওয়ার কারণে গরমের তীব্রতা কিছুটা কম থাকলেও গত রবিবারের পর থেকে সারা দেশে তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে শুরু করেছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। আর চাহিদা বাড়তেই শহরের বাইরে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে, লোডশেডিং পরিস্থিতি ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে।

মেহেরপুর (Meherpur)-এর বাসিন্দা আসাদুজ্জামান লিটন বিবিসি বাংলাকে জানান, তাদের এলাকায় প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে। বুধবার সকাল ৯টায় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর ১০টায় আসে, ১১টায় আবার যায়, ১২টায় ফিরে। এরপর দুপুর ১টার দিকে আবার বিদ্যুৎ চলে গিয়ে বিকেল ৩টায় আসে। বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৪টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকলেও পরে আবার এক ঘণ্টার মতো বন্ধ ছিল।

লিটন জানান, তিনি পৌরসভার বাইরের এলাকায় থাকেন, যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। তার ভাষায়, শহরের চেয়ে বাইরের এলাকাতেই পরিস্থিতি বেশি খারাপ। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চারবার বিদ্যুৎ গেছে। প্রতিবারই এক থেকে দুই ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ ছিল না। ৪০ ডিগ্রির কাছাকাছি তাপমাত্রায় ঘরের ভেতরে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ না থাকলে হাতপাখাই ভরসা।

মেহেরপুর শহরের বাসিন্দা রাশেদুজ্জামানও জানিয়েছেন, পৌর এলাকায় তুলনামূলকভাবে লোডশেডিং কম। দিনে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিনবার বিদ্যুৎ গেলেও গ্রামের তুলনায় সেটি অনেক সহনীয়।

পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মেহেরপুর জোনের জেনারেল ম্যানেজার স্বদেশ কুমার ঘোষ বলেন, মোট চাহিদার তুলনায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাচ্ছেন তারা। ফলে বাধ্য হয়েই লোডশেডিং করতে হচ্ছে। তার হিসাবে, গত দুই দিনে পৌর এলাকার বাইরে গড়ে ছয় থেকে আট ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না।

একই ধরনের চিত্র দেশের অন্য এলাকাতেও। লালমনিরহাটের গৃহিণী ফারাহ ফিবা জানান, পৌর এলাকায় থাকায় দিনে দুই-তিনবার বা তারও কম বিদ্যুৎ যাচ্ছে। কিন্তু শহরের বাইরের এলাকাগুলোতে লোডশেডিং বাড়ছে বলে তিনি পরিচিতদের কাছ থেকে শুনছেন।

চট্টগ্রাম (Chattogram) সিটি করপোরেশন এলাকার হেমসেন লেনের এক বাসিন্দা জানান, গত কয়েকদিন ধরেই ঘন ঘন বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত অন্তত চারবার লোডশেডিং হয়েছে।

ময়মনসিংহ (Mymensingh)-এর স্থানীয় সাংবাদিক আতাউর রহমান জুয়েল জানান, বিভাগের সব জেলাতেই লোডশেডিং বেড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পিডিবি সূত্রের বরাতে তিনি বলেন, বিভাগের ছয় জেলায় দিনে গড়ে ১ হাজার ৭৫ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে প্রায় ৩২৫ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।

পরিস্থিতির প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হয়েছে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (PGCB) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (BPDB)-এর তথ্য বিশ্লেষণে। গত কয়েক দিনে পিক আওয়ারে সারা দেশে লোডশেডিং ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।

পিডিবির তথ্য বলছে, এপ্রিলের প্রথমার্ধে দিনে ও রাতে গড়ে ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। ১৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় দেশের চাহিদা ছিল ১৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন হয় ১৪ হাজার ৮০ মেগাওয়াট। সেই সময় ঘাটতি ছিল ৬৮৮ মেগাওয়াট।

পরদিন বুধবার বিকেল ৩টায় চাহিদা দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৬০০ মেগাওয়াটে। অথচ উৎপাদন হয় মাত্র ১২ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, তখন সারা দেশে লোডশেডিংয়ের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৮৪৩ মেগাওয়াট—যা চলতি মাসে সর্বোচ্চ।

পিডিবির সদস্য মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। কয়লাভিত্তিক কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে রয়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির ঘাটতিও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে চাহিদা থাকলেও সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না।

পিজিসিবির ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে লোডশেডিং প্রায় শূন্যের কাছাকাছি ছিল। কিন্তু তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে তা দ্রুত বাড়তে শুরু করে। প্রথমে গড়ে ৭০০ থেকে ৯০০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকলেও ১৫ এপ্রিলের পর তা ১ হাজার ৮০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।

দেশে বর্তমানে আমদানিসহ ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্রের মোট স্থাপিত সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু বাস্তবে তার অর্ধেকেরও কম ব্যবহার করা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সরবরাহের সীমাবদ্ধতাই এর মূল কারণ।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম. তামিম (M Tamim) বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ফার্নেস অয়েল, কয়লা ও গ্যাস—সব ক্ষেত্রেই চাপ রয়েছে। এসব ঘাটতির প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। তার আশঙ্কা, সামনে গরম আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

গত এক মাসের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দিনের তুলনায় সন্ধ্যা ও রাতের পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি। ফলে রাতেই লোডশেডিংয়ের চাপ বেশি অনুভূত হচ্ছে।

পিডিবির সদস্য জহুরুল ইসলাম বলেন, বৈশ্বিক যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কয়লা ও তেলের সরবরাহ শৃঙ্খলে সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর ফলে কয়েকটি ইউনিট আন্ডারলোডে চলছে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহও সীমিত। পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হলে গ্রীষ্মের বাকি সময় বিদ্যুৎ পরিস্থিতি আরও চাপে পড়তে পারে।