যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ঘনিয়ে এসেছে—ট্রাম্পের দাবি, ইউরেনিয়াম ইস্যুতে বড় অগ্রগতি

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে কূটনৈতিক উত্তাপ ছড়িয়েছে যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইরানের (Iran) সম্পর্ক ঘিরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) দাবি করেছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান এখন শান্তিচুক্তির খুব কাছাকাছি অবস্থানে পৌঁছেছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, আলোচনার অন্যতম বড় বাধা—ইরানের ইউরেনিয়াম ইস্যুতেও ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) স্থানীয় সময় এক ভাষণে ট্রাম্প বলেন, ইরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরে সম্মত হয়েছে। এই ‘নিউক্লিয়ার ডাস্ট’—যেমনটি তিনি উল্লেখ করেন—যুক্তরাষ্ট্রের মতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাব্য উপাদান হিসেবে বিবেচিত। যদিও এই হস্তান্তরের প্রক্রিয়া কীভাবে সম্পন্ন হবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি। অন্যদিকে, ইরানের পক্ষ থেকেও এ বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চিত কোনো বক্তব্য আসেনি।

এর আগে, চুক্তিতে না পৌঁছালে পুনরায় বিমান হামলা চালানো এবং ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ অব্যাহত রাখার হুঁশিয়ারি দিয়েছিল ওয়াশিংটন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ (Pete Hegseth) সতর্ক করে বলেন, ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিলে অবরোধ চলবে এবং প্রয়োজন হলে অবকাঠামো, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালানো হবে।

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে। ইসরায়েল (Israel) ও লেবাননের (Lebanon) মধ্যে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। ট্রাম্প আশা প্রকাশ করেন, দুই দেশের নেতারা আগামী চার থেকে পাঁচ দিনের মধ্যে হোয়াইট হাউসে বৈঠকে বসতে পারেন। তবে হিজবুল্লাহ (Hezbollah) এই যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে নেবে কি না, তা এখনও অনিশ্চিত। সংগঠনটির এক শীর্ষ নেতা জানিয়েছেন, ইসরায়েল হামলা বন্ধ রাখলে তারাও যুদ্ধবিরতিতে থাকবে।

যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঠিক আগে লেবানন থেকে রকেট ছোড়া হলে পাল্টা হামলার কথা জানিয়েছে ইসরায়েলি বাহিনী। তবুও দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছেন। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানও আলাদা একটি যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল।

এই পরিস্থিতির মধ্যে পাকিস্তান (Pakistan) কূটনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সঙ্গে বৈঠক করেন। যদিও গত সপ্তাহের প্রথম দফা আলোচনার মতো এই বৈঠকও কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হয়।

জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান শান্তি আলোচনায় তেহরান ‘সতর্কভাবে আশাবাদী’ এবং তারা একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ ফলাফল’ প্রত্যাশা করছে।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়েও চলছে টানাপোড়েন। ট্রাম্প বলেছেন, যেকোনো চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম স্থায়ীভাবে বন্ধ করতে হবে। যদিও জাতিসংঘের পারমাণবিক সংস্থা এখন পর্যন্ত ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো প্রমাণ পায়নি।

খবরে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি ২০ বছরের জন্য স্থগিত রাখতে চায়। বিপরীতে তেহরান পাঁচ বছরের জন্য স্থগিতের প্রস্তাব দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করেছে ওয়াশিংটন। ইরান বরাবরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করে আসছে এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করাকে তাদের ‘সার্বভৌম অধিকার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

এদিকে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার একটি প্রস্তাব নাকচ হয়েছে। ডেমোক্র্যাটরা ব্যয় বৃদ্ধি ও বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা তুলে ধরে প্রস্তাবটি উত্থাপন করলেও তা গৃহীত হয়নি।

হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট (Karoline Leavitt) জানান, পরবর্তী বৈঠক ইসলামাবাদে হতে পারে। যদিও পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ বিষয়ে এখনো কোনো নির্দিষ্ট তারিখ ঠিক হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স (JD Vance) জানিয়েছেন, ইরানকে যুদ্ধ শেষ ও দীর্ঘমেয়াদি পারমাণবিক বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি বড় চুক্তির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ সতর্ক করে বলেছেন, ইরান এখন একটি ‘ঐতিহাসিক মোড়ে’ দাঁড়িয়ে আছে—চুক্তির পথে না এগোলে তা ‘অতল গহ্বরে’ তলিয়ে যেতে পারে।

হরমুজ প্রণালি—যেখানে দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়—বর্তমানে বড় উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দু। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল হামলার পর থেকে সেখানে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ। এই প্রেক্ষাপটে ব্রেন্ট নর্থ সি ক্রুডের দাম ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ৯৮ দশমিক ০১ ডলারে পৌঁছেছে।

ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্দরগুলোতে অবরোধ জোরদার করেছে। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড দাবি করেছে, ইরানের বন্দর থেকে ছাড়তে চাওয়া ১৩টি জাহাজ ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে, ফলে দেশটির বাণিজ্য কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

এছাড়া, বুধবার ইরানের তেলখাতে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ওয়াশিংটন। ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট (Scott Bessent) জানান, এতে শাসকগোষ্ঠীর প্রভাবশালী ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

অন্যদিকে ইরানের সামরিক কেন্দ্রীয় কমান্ডের প্রধান আলী আবদোল্লাহি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পিছু না হটলে পারস্য উপসাগর, ওমান সাগর ও লোহিত সাগরে কোনো আমদানি-রপ্তানি চলতে দেওয়া হবে না। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে মার্কিন উপস্থিতি বাড়ানো হলে তাদের জাহাজ ডুবিয়ে দেওয়ারও হুমকি দেন তিনি।