মোহাম্মদপুরে সন্ত্রাসের ছায়া—১৬ গ্রুপের দাপটে আতঙ্কিত জনপদ

রাজধানীর মোহাম্মদপুর (Mohammadpur) যেন ক্রমেই রূপ নিচ্ছে এক ভয়ের নগরীতে। আজ ছিনতাই, তো কাল হাত-পা কেটে বুনো উল্লাসে খু’\ন। পরদিনই আবার রাস্তায় পড়ে থাকে রক্তাক্ত নিথর দেহ। চাঁদাবাজি থেকে প্রকাশ্য মাদক কারবার—সবকিছুই যেন এখানে এখন নিত্যদিনের দৃশ্য। সব দেখেও এলাকার বাসিন্দারা আতঙ্কে মুখ খুলতে সাহস পান না। মাঝেমধ্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান কিছুটা স্বস্তি আনলেও, অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ঝরে রক্ত, নতুন করে শঙ্কা গ্রাস করে মানুষকে।

এই ছোট্ট এলাকাকে কীভাবে ধীরে ধীরে সন্ত্রাসের জনপদে পরিণত করা হচ্ছে—তার খোঁজ করতে গিয়ে উঠে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। অন্তত ১৬টি সন্ত্রাসী গ্রুপ মোহাম্মদপুরজুড়ে সক্রিয়, যাদের সদস্য সংখ্যা প্রায় ১০৫ জন। এর পেছনে ছায়ার মতো থেকে অন্তত ১৭ জন ‘বড় ভাই’ এসব গ্রুপকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে জানা গেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা থেকে শুরু করে তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীদের নামও উঠে এসেছে এই পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায়। পুলিশের তৈরি করা তালিকা ঘেঁটে এবং স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি ভিন্ন। তাদের মতে, এসব গ্রুপের সদস্যদের নিয়মিত গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, কিন্তু জামিনে বের হয়ে তারা আবারও একই অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।

বাংলাদেশ পুলিশ (Bangladesh Police)-এর তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার মো. ইবনে মিজান বলেন, এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যদিও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটছে এবং সেগুলোতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অন্যদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police)-এর অতিরিক্ত কমিশনার এস এন মো. নজরুল ইসলাম বলেন, “অপরাধীদের কোনো দল নেই। তারা নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ক্ষমতাসীনদের ছায়া খোঁজে। তবে আমরা জিরো টলারেন্স নীতিতে কাজ করছি।” তিনি জানান, প্রতিদিনই গ্রেপ্তার অভিযান চলছে, কিন্তু জামিনে বের হয়ে অপরাধীরা আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে।

একই ধরনের বক্তব্য এসেছে র‍্যাব (Rapid Action Battalion)-এর পক্ষ থেকেও। র‍্যাব-২-এর অধিনায়ক মো. খালিদুল হক হাওলাদার জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রায় দেড় হাজার কিশোর গ্যাং সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তারা বেরিয়ে এসে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ে।

স্থানীয়দের ভাষ্য আরও ভয়াবহ। তারা বলছেন, মূলত চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে নৃশংস হ’\ত্যা ঘটছে নিয়মিত। পাশাপাশি বেড়েছে ছিনতাই, চুরি ও আধিপত্য বিস্তারের সংঘর্ষ। জমি কেনাবেচার নামে দখল ও পাল্টা দখলদারিত্বও নতুন করে সংঘাত বাড়াচ্ছে।

মাত্র ২ দশমিক ৮৭ বর্গমাইলের এই এলাকায় ৬৫টি অংশ ভাগ করে নিয়েছে ১৬টি সন্ত্রাসী গ্রুপ। এই রক্তক্ষয়ী দখলযুদ্ধে গত পাঁচ দিনেই দুটি নৃশংস হ’\ত্যা ঘটেছে, যা নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। ‘কিশোর গ্যাং’ নামে পরিচিত হলেও, এসব গ্রুপ এখন এলাকায় অপরাধ জগতের নিয়ন্ত্রণ নিতে মরিয়া।

এই গ্রুপগুলোর মধ্যে রয়েছে—পাটালি গ্রুপ, লেভেল হাই, আনোয়ার, ফরহাদ, আর্মি আলমগীর-নবী, ডাইল্লা, এলেক্স, আকবর, গাংচিল, ল ঠেলা, আশরাফ, স্টার বন্ড, ভাইব্বা ল কিং, চেতালেই ভেজাল, টক্কর ল এবং ঘুটা দে গ্রুপ। প্রতিটি গ্রুপের রয়েছে নির্দিষ্ট এলাকা ও আলাদা আধিপত্য।

সম্প্রতি রায়েরবাজার এলাকায় এলেক্স গ্রুপের নেতা ইমন হোসেন ওরফে এলেক্স ইমনকে কুপিয়ে হ’\ত্যা করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, চাঁদাবাজির ভাগাভাগি নিয়ে বিরোধের জের ধরেই এই খু’\ন সংঘটিত হয়েছে। এর পেছনে প্রভাবশালী সন্ত্রাসীদের ইশারা ছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে।

পুলিশের তালিকায় উঠে এসেছে—কিছু গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ। তবে অভিযুক্তরা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং একে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।

একই সঙ্গে কয়েকটি গ্রুপের পেছনে রয়েছে এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের প্রত্যক্ষ প্রভাব। তাদের ছত্রছায়ায় মাদক, চাঁদাবাজি, ছিনতাই থেকে শুরু করে দখলদারিত্ব—সবই চলছে প্রকাশ্যেই।

সব মিলিয়ে, মোহাম্মদপুর যেন এখন এক অদৃশ্য ভয় আর অস্থিরতার শহর। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানের পরও পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি না হওয়ায় প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—এই দুষ্টচক্র ভাঙবে কবে?