ইসলামাবাদে কূটনৈতিক তৎপরতা তুঙ্গে: ইরান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় দফার আলোচনার আগে নিরাপত্তায় কঠোর প্রস্তুতি

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা ঘিরে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যেন এক অদৃশ্য উত্তেজনার আবহ তৈরি হয়েছে। কূটনৈতিক অঙ্গনে বাড়তি তৎপরতা, শহরজুড়ে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা—সব মিলিয়ে রাজধানী এখন এক ভিন্ন বাস্তবতায় অবস্থান করছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আলোচনায় অংশ নিতে আজ রোববার (১৯ এপ্রিল) ওয়াশিংটন থেকে একটি প্রতিনিধিদল ইতোমধ্যেই ইসলামাবাদে পৌঁছেছে।

আগামী সপ্তাহেই এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে এখনো পর্যন্ত পাকিস্তান, ইরান কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার নির্দিষ্ট সময়সূচি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে কূটনৈতিক মহলে যেমন জল্পনা-কল্পনা চলছে, তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যেও রয়েছে কৌতূহল ও অনিশ্চয়তা।

বিদেশি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের আগমনকে কেন্দ্র করে ইসলামাবাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা এমনভাবে জোরদার করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে নজিরবিহীন বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। ইসলামাবাদ পুলিশ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত শহরের রেড জোন ও বর্ধিত রেড জোন এলাকায় সব ধরনের যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। নাগরিকদের বিকল্প সড়ক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এদিকে ইসলামাবাদ ও রাওয়ালপিণ্ডির জেলা প্রশাসন যৌথভাবে দুই শহরে গণপরিবহণ ও পণ্যবাহী যান চলাচল স্থগিত ঘোষণা করেছে। কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ না করেই এই নির্দেশ জারি করা হয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নাগরিকদের নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে পূর্ণ সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে, যদিও এতে জনদুর্ভোগের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

রাওয়ালপিণ্ডি পুলিশের সিটি অফিসার সৈয়দ খালিদ মাহমুদ হামদানির নির্দেশনায় পুরো শহরকে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। বিদেশি প্রতিনিধিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ১০ হাজারেরও বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি শহরের প্রবেশ ও বহির্গমন পয়েন্টগুলোতে ৬০০টির বেশি বিশেষ পিকেট বসানো হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থান নিয়েছে এলিট কমান্ডো ও স্নাইপাররা, আর ডলফিন ফোর্স ও কুইক রেসপন্স ইউনিটগুলো চালাচ্ছে সার্বক্ষণিক টহল। স্পর্শকাতর স্থাপনা ও আবাসিক এলাকাগুলো নজরদারিতে রাখতে ‘সেফ সিটি’ প্রকল্পের সিসিটিভি ক্যামেরা ও আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করা হচ্ছে।

এর আগে গত ৮ এপ্রিল পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের মধ্যস্থতায় দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর ১০ ও ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে প্রথম দফার বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মূলত গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার পর যে সংঘাত শুরু হয়, তা দ্রুতই মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করে, যার অংশ হিসেবে সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের তেহরান সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।

ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ এক টেলিভিশন ভাষণে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে বটে, তবে এখনো বেশ কিছু মৌলিক ইস্যুতে বড় ধরনের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে বর্তমানে ‘খুবই ফলপ্রসূ’ আলোচনা চলছে, তবে একইসঙ্গে তিনি তেহরানকে সতর্ক করে দিয়েছেন—কোনো ধরনের ‘ব্ল্যাকমেইল’ কৌশল গ্রহণ করলে তা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলবে।

দ্বিতীয় দফার এই আলোচনাকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মহলের প্রত্যাশা এখন তুঙ্গে। দীর্ঘদিনের উত্তেজনা ও সংঘাতের পর একটি স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজে পাওয়া যাবে কি না—সেই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় হয়ে উঠেছে।

সূত্র: জিও নিউজ।