জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ শিশু জাবির ইব্রাহিমের মা রোকেয়া বেগমকে সংরক্ষিত নারী আসনে সংসদ সদস্য হিসেবে মনোনীত করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী (Bangladesh Jamaat-e-Islami) নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক অঙ্গনে যেমন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, তেমনি আবেগও ছড়িয়ে পড়েছে নানা মহলে।
সোমবার সন্ধ্যায় রাজধানীর মগবাজারে দলীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে জোটের পক্ষ থেকে মোট ১৩ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক হামিদুর রহমান আযাদ (Hamidur Rahman Azad) এই তালিকা প্রকাশ করেন। একক প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হওয়ায় রোকেয়া বেগমের সংসদে যাওয়া এখন কার্যত সময়ের অপেক্ষা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল মুহূর্তে উত্তরার কেসি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নার্সারি পড়ুয়া শিশু জাবির ইব্রাহিম পু’লিশের গু’\লিতে প্রাণ হারায়। মাত্র ছয় বছর বয়সী এই শিশু তার বাবা কবির হোসাইনের সঙ্গে বিজয় মিছিলে অংশ নিয়েছিল। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর মিছিলটি যখন উত্তরার পূর্ব থানার সামনে দিয়ে যাচ্ছিল, তখন পু’লিশের ছোঁড়া গু’\লি জাবিরের উরুতে বিদ্ধ হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে দ্রুত কুয়েত-মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হলেও রক্ত মেলাতে দেরি হওয়ায় সন্ধ্যায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করে সে।
শহীদ জাবিরের মা রোকেয়া বেগম পেশায় একজন গৃহিনী। তার স্বামী একটি বেসরকারি মোবাইল রিটেইলার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। জানা যায়, সন্তানদের নিয়ে ৫ আগস্টের ঐতিহাসিক লংমার্চে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন রোকেয়া বেগম নিজেই— যা পরবর্তীতে তার জীবনে বয়ে আনে এক গভীর শোকগাঁথা।
সংরক্ষিত নারী আসনে জামায়াত নেতৃত্বাধীন এই জোট মোট ১৩টি আসন পেতে যাচ্ছে। আনুপাতিক হিসেবে জামায়াতের একারই ১২টি আসন পাওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক সমঝোতার অংশ হিসেবে তারা শরিক দলগুলোর জন্য তিনটি আসন ছেড়ে দিয়েছে। জোটের শরিক ন্যাশনাল সিভিল পার্টি (National Civil Party), বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস (Bangladesh Khelafat Majlis) এবং জাগপা (JAGPA)-কে একটি করে আসন দেওয়া হয়েছে।
এর ফলে এনসিপির সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুইটিতে। জামায়াত মনোনীত প্রার্থীদের মধ্যে রয়েছেন নারী অধিকার আন্দোলন নামের একটি সংগঠনের নেত্রী প্রকৌশলী মারদিয়া মমতাজ, যিনি বর্তমানে ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। এছাড়া দলটির মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নূরুন্নিসা সিদ্দীকা, সহকারী সেক্রেটারি মারজিয়া বেগম, আইন বিভাগের সেক্রেটারি সাবিকুন নাহার মুন্নি এবং প্রচার বিভাগের সেক্রেটারি নাজমুন নাহার নীলুও মনোনয়ন পেয়েছেন। তালিকায় আরও আছেন সাবেক সেক্রেটারি মাহফুজা সিদ্দিকা এবং কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য সাজেদা সামাদ ও শামছুন্নাহার নাহার।
মঙ্গলবার এই প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিন নির্ধারিত রয়েছে।
জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে এনসিপি থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন মনিরা শারমিন ও মাহমুদা আলম মিতু। ঝালকাঠী-১ আসনে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে থাকা মাহমুদা মিতু জামায়াতের সমর্থনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই রাজনৈতিক সমঝোতার ধারাবাহিকতায় এখন তাকে সংরক্ষিত আসনে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে মনিরা শারমিন দলটির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন।
জোটের অন্য দুই প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন জাগপার চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রকৌশলী মাহবুবা হাকিম। জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধান সংসদ নির্বাচনে সরে দাঁড়ানোর বিনিময়ে তার বোন তাসমিয়া প্রধানকে এই আসনে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
এছাড়া সংসদ নির্বাচনে দুটি আসনে জয়ী হওয়া মামুনুল হক (Mamunul Haque)-এর নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকেও জামায়াত তাদের কোটা থেকে একটি আসন প্রদান করেছে। মূলত জোটবদ্ধ রাজনীতির কৌশলগত বাস্তবতায় নিজেদের অংশ থেকে শরিকদের জন্য এই আসনগুলো বণ্টন করেছে জামায়াত।
