তেলের দাম বাড়ার ধাক্কায় ‘সাফল্য’ ম্লান: নতুন সরকারের মধুচন্দ্রিমায় অস্বস্তির সুর

মাত্র কদিন আগে নির্বাচিত সরকারের প্রথম দুই মাস পূর্ণ হয়েছে। এই উপলক্ষে সরকারের পক্ষ থেকে একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়, যেখানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একাধিক মুখপাত্র বিএনপি সরকারের প্রথম ৬০ দিনের শাসনামলের ৬০টি উল্লেখযোগ্য সাফল্যের তালিকা তুলে ধরেন। সেই তালিকায় আন্তর্জাতিক বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে স্থান পায়—বিশেষ করে ইরান (Iran) ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র (United States)-এর মধ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে।

মুখপাত্ররা বিষয়টিকে সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে তুলে ধরলেও, দিনের শেষ ভাগে সেই দাবিই যেন প্রশ্নের মুখে পড়ে। দুপুরে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সন্ধ্যায় জ্বালানি মন্ত্রণালয় হঠাৎ করেই তেলের দাম প্রকারভেদে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণা দেয়। ঘটনাটি সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এমনও মনে হয়েছে, যারা সংবাদ সম্মেলনটি আয়োজন করেছিলেন, তারা হয়তো আসন্ন মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সম্পর্কে অবগতই ছিলেন না।

অনেকে মনে করেন, অন্তত ওই দিনটি পেরিয়ে গেলে সরকারের ভাবমূর্তির জন্য তা কিছুটা সহায়ক হতো। কারণ, এর ঠিক এক সপ্তাহ আগে জ্বালানিমন্ত্রী নিজেই আশ্বাস দিয়েছিলেন যে এপ্রিল মাসে তেলের দাম বাড়ানো হবে না। তিনি বলেছিলেন, মে মাসে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু সেই আশ্বাস শেষ পর্যন্ত টেকেনি। প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল নীতিগত পরিবর্তন, নাকি আন্তর্জাতিক চাপের ফল?

বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে, জ্বালানি তেলের দাম স্থির রাখা এবং ফ্যামিলি কার্ডসহ জনমুখী নানা কর্মসূচি নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund)। অভিযোগ রয়েছে, এসব কারণেই তারা ঋণের কিস্তি ছাড়ে অনাগ্রহ দেখিয়েছে এবং বাজেটে ভর্তুকির মাত্রা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যদিও অর্থমন্ত্রী আনুষ্ঠানিকভাবে এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে আইএমএফের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছেন, তবে ওয়াশিংটনে বৈঠক শেষে দেশে ফিরে তিনি স্বীকার করেছেন—কিছু বিষয়ে মতবিরোধ রয়েছে।

এদিকে সীমিত আয়ের সাধারণ মানুষ এখন জ্বালানি তেলের পর বিদ্যুতের দাম বাড়ার সম্ভাবনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। সরকারের বিভিন্ন কার্ডভিত্তিক সহায়তা কর্মসূচি কতজনের উপকারে এসেছে, তার হিসাব স্পষ্ট নয়; তবে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রভাব যে সার্বিকভাবে সবাইকে বহন করতে হবে, তা অনস্বীকার্য।

আরও বিস্ময়ের বিষয়, মন্ত্রীরা লিটারপ্রতি ২০ টাকা বৃদ্ধিকে ‘সামান্য’ বলে অভিহিত করায় জনমনে আতঙ্ক আরও বেড়েছে। মানুষের প্রশ্ন—ঠিক কতটা বৃদ্ধি হলে সেটি আর ‘সামান্য’ থাকবে? ইতোমধ্যে পরিবহন খাতে ভাড়া বাড়ানোর দাবি উঠেছে, যা নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জন্য জীবনযাত্রা আরও কঠিন করে তুলতে পারে।

পরিস্থিতি জটিল হয়েছে পেট্রোল পাম্পে সরবরাহ সংকটের অভিযোগে। অতিরিক্ত মূল্য দিয়েও কাঙ্ক্ষিত জ্বালানি না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের, যার স্থায়ী সমাধান এখনো মেলেনি। সব মিলিয়ে, নতুন সরকারের সঙ্গে জনগণের যে আশাবাদী ‘মধুচন্দ্রিমা’ শুরু হয়েছিল, তাতে যেন আচমকা ছন্দপতন দেখা দিয়েছে।

দীর্ঘ ২৫ বছর পর এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি দেশের মানুষ আবারও গণতান্ত্রিকভাবে নিজেদের পছন্দের সরকার নির্বাচনের সুযোগ পায়। ফলে নতুন সরকারের প্রতি জনগণের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। তারা শুরুতে সরকারের ভুলত্রুটিগুলো উপেক্ষা করে ইতিবাচক দিকগুলোকে গুরুত্ব দিয়েছিল।

তবে খুব বেশি দিন আগের কথা নয়—শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) দেশত্যাগ করার পর রাষ্ট্রযন্ত্র কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল। পুলিশের একটি বড় অংশ দায়িত্ব থেকে সরে যায়, অনেক থানা কার্যত পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ পর্যন্ত করতে হয়েছে ছাত্রদের।

সেই সময় অন্তর্বর্তী দায়িত্ব নেয় ড. ইউনূস (Muhammad Yunus)-এর নেতৃত্বাধীন সরকার। নানা সংকট, রাজনৈতিক চাপ এবং বহিরাগত প্রভাব মোকাবিলা করে তারা পরিস্থিতি কিছুটা স্থিতিশীল করতে সক্ষম হয় এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করে। এই প্রক্রিয়া সহজ ছিল না—অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা ও আন্তর্জাতিক চাপ ছিল সমান্তরাল।

তবে সমালোচনাও রয়েছে। বিশেষ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার সম্পূর্ণ না করায় পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার বীজ রয়ে গেছে—যার প্রভাব এখনো অনুভূত হচ্ছে।

আশ্চর্যের বিষয়, সেই অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সুবিধাভোগী হিসেবেই বিবেচিত বিএনপির কিছু অংশ এখন তাদের কঠোর সমালোচনায় সরব। বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে ভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কাজ করতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রতি সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত। অতিরিক্ত প্রচার কিংবা চাটুকারিতার পুনরাবৃত্তি অতীতের মতোই নেতিবাচক ফল বয়ে আনতে পারে—এই অভিজ্ঞতা নতুন নয়।

সবশেষে বলা যায়, গণতন্ত্রের যে প্রত্যাবর্তন ঘটেছে, তা ধরে রাখা এখন সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এজন্য প্রয়োজন সঠিক রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণ, জনস্বার্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জনগণের আস্থা অটুট রাখা।