তাপপ্রবাহে বাড়ছে বিদ্যুতের চাপ, দেশজুড়ে লোডশেডিং নতুন মাত্রায়

দেশের তাপমাত্রা যত বাড়ছে, ততই বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা—আর তার সরাসরি প্রভাব পড়ছে লোডশেডিং পরিস্থিতিতে। এপ্রিলের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ ঘাটতি নতুন মাত্রা পেয়েছে, যা মে-জুনে আরও ভয়াবহ আকার নিতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত সোমবার সন্ধ্যায় বিদ্যুতের চাহিদা পৌঁছায় প্রায় ১৫ হাজার ৩৩০ মেগাওয়াটে। এর বিপরীতে ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৩৫৮ মেগাওয়াট। একই দিনে সর্বোচ্চ লোডশেডিং দাঁড়ায় ১ হাজার ৯৩২ মেগাওয়াটে। সাম্প্রতিক কয়েক দিনের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং ইতোমধ্যে ২ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর (Bangladesh Meteorological Department)-এর তথ্যমতে, গত রবি, সোম ও মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল যথাক্রমে ৩৬.৩, ৩৬.৬ এবং ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (PGCB) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (PDB)-এর তথ্য বলছে, প্রতিদিনই লোডশেডিং প্রায় ১৯০০ মেগাওয়াটের কাছাকাছি ছিল।

বিদ্যুতের সরবরাহ বিবেচনায় ঢাকা অঞ্চলে লোডশেড তুলনামূলক কম হলেও সময়ের হিসেবে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছে বরিশাল অঞ্চল—যেখানে দৈনিক ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এরপর দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকে রাজশাহী, খুলনা, চট্টগ্রাম, ঢাকা বিভাগ, কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুরের বিভিন্ন এলাকা। ঢাকায় লোডশেডিং সীমিত—প্রতিদিন গড়ে ১ থেকে ২ ঘণ্টা, এমনকি কিছু এলাকায় তা প্রায় শূন্য।

গরম যত বাড়ছে, তত বাড়ছে ঘাটতি

তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আবাসিক খাতে ফ্যান, এসি ও অন্যান্য কুলিং যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। একইসঙ্গে কৃষিতে বোরো সেচের চাহিদা বেড়েছে এবং শিল্প খাতে বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে হঠাৎ করেই বিদ্যুতের চাহিদা লাফিয়ে বাড়ছে, কিন্তু উৎপাদন সেই অনুপাতে বাড়ানো যাচ্ছে না—ফলাফল হিসেবে বাড়ছে লোডশেডিং।

উৎপাদন, চাহিদা ও সরবরাহে বাড়ছে ব্যবধান

পিডিবির তথ্যে দেখা যায়, দেশে সাবস্টেশন পর্যায়ে দৈনিক বিদ্যুতের গড় চাহিদা প্রায় সাড়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার মেগাওয়াট। অথচ উৎপাদন হচ্ছে মাত্র ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিনই ১ থেকে ২ হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি তৈরি হচ্ছে, যা পিক আওয়ারে আরও বেড়ে যায়।

সোমবার সন্ধ্যার পিক আওয়ারে চাহিদা ছিল ১৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট, কিন্তু উৎপাদন হয়েছে ১৩ হাজার ১৯৮ মেগাওয়াট। ফলে লোডশেডিং করতে হয়েছে ১ হাজার ৯১২ মেগাওয়াট। দিনের বিভিন্ন সময়ে এই ঘাটতি ৯১৩ থেকে ১৮৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত ওঠানামা করেছে।

অঞ্চলভেদে লোডশেডিংয়ের বৈষম্য চিত্র

দেশজুড়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে তীব্র বৈষম্য স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বরিশাল অঞ্চলে দিনে ৮-১০ বার বিদ্যুৎ চলে যায় এবং মোট ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। রাজশাহীতে দিনে ৬-৮ বার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে ৮-১২ ঘণ্টা অন্ধকারে থাকতে হয়। খুলনায় ৬-১০ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না, যা শিল্প উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

চট্টগ্রাম শহরে পরিস্থিতি কিছুটা সহনীয় হলেও গ্রামীণ এলাকায় দিনে ৬-৮ ঘণ্টা, কোথাও কোথাও ১৬-১৭ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না। ঢাকা বিভাগের গ্রাম ও উপজেলা এলাকায় দিনে ৫-৭ বার বিদ্যুৎ যায় এবং ৬-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং হয়।

কুমিল্লা, ময়মনসিংহ, সিলেট ও রংপুর অঞ্চলেও একই চিত্র—গ্রামাঞ্চলে ভোগান্তি বেশি, শহরে তুলনামূলক কম। পিক আওয়ারে উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩৮ শতাংশ ঢাকায় সরবরাহ করা হয়, ফলে অন্য অঞ্চলে ঘাটতি বেড়ে যায়।

লোডশেডিংয়ের প্রভাব পড়ছে কৃষি, শিল্প ও ব্যবসায়

নওগাঁ, নাটোর, কুমিল্লা, কুড়িগ্রাম, পিরোজপুরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি সেচ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গাজীপুর শিল্পাঞ্চলে ৪৮৪ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩১২ মেগাওয়াট। ফলে প্রতিদিন ৬-৮ ঘণ্টা লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

এর প্রভাব পড়ছে গার্মেন্টস, তাঁত শিল্প ও অন্যান্য কারখানায়—উৎপাদন কমে যাচ্ছে, কোথাও কোথাও অর্ধেকে নেমে এসেছে। সেচ পাম্প চালাতে না পারায় বোরো মৌসুমে কৃষকরাও বড় সংকটে পড়েছেন।

সরকারি হিসাব অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৪৯৪ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকটের কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এদিকে গ্রীষ্মে সর্বোচ্চ চাহিদা সাড়ে ১৮ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছাতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ফলে সামনে আরও বড় বিদ্যুৎ সংকটের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।