গাজা পুনর্গঠনে গোপন বৈঠক, ‘বোর্ড অব পিস’ ঘিরে বাড়ছে বিতর্ক

ইসরায়েলি দখলদারিত্বের মধ্যেই যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনায় এসেছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর তৈরি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম ‘বোর্ড অব পিস’। ব্রিটিশ গণমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (Financial Times)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই প্ল্যাটফর্মের সদস্যদের মধ্যে সম্প্রতি একটি গোপন বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে, যেখানে গাজার পুনর্গঠনে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড (DP World)-কে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজা পুনর্গঠনে ‘বোর্ড অব পিস’-এর সদস্য দেশগুলো ইতোমধ্যে ৫০০ কোটি ডলারের বেশি সহায়তা দিয়েছে, যদিও মোট প্রয়োজন প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। অন্তত তিনটি সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, দুবাইভিত্তিক লজিস্টিক জায়ান্ট ডিপি ওয়ার্ল্ড গাজার বড় অংশের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ত্রাণ ও পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পেতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়ায় ফিলিস্তিনের অংশগ্রহণ বা মতামত উপেক্ষিত হওয়ায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

ইসরায়েল ও হামাসের সংঘাতে গাজা কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের উদ্যোগে গত ২৩ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বোর্ড অব পিস’-এর যাত্রা শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন দেশকে এতে অংশ নিতে আমন্ত্রণ জানালেও ভারতসহ কয়েকটি দেশ এতে যোগ দেয়নি। বৈঠকে ট্রাম্প গাজা ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ইচ্ছার কথাও উল্লেখ করেছিলেন এবং সেখানে ‘রিভিয়েরা অব দ্য মিডল ইস্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। এই ঘোষণার পর থেকেই প্রশ্ন উঠতে থাকে—শান্তি প্রক্রিয়ার আড়ালে পশ্চিম এশিয়ায় ব্যবসায়িক স্বার্থ জোরদারের চেষ্টা করছে কি না ওয়াশিংটন।

গোপন বৈঠকের খবর সামনে আসার সময়টিও তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমানে গাজায় শান্তি প্রক্রিয়া প্রায় স্থবির। ইসরায়েলি বাহিনী এখনো উপত্যকার বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে এবং গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও মানবিক ত্রাণ প্রবেশ অত্যন্ত সীমিত রয়ে গেছে। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সেই যুদ্ধবিরতির পরও ইসরায়েলি হামলায় আরও সাত শতাধিক মানুষ নি’\হত এবং প্রায় দুই হাজার মানুষ আ’\হত হয়েছেন।

ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের হাতে আসা একটি খসড়া প্রস্তাবে দেখা গেছে, সেখানে একটি নিরাপদ ও শনাক্তযোগ্য সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বন্দরভিত্তিক অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ক্ষুদ্র শিল্প উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছে। তবে এই নথির প্রকৃত উৎস কিংবা আলোচনা কতদূর অগ্রসর হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। ডিপি ওয়ার্ল্ডের এক মুখপাত্র এ বিষয়ে কোনো তথ্য থাকার কথা অস্বীকার করেছেন, একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো মন্তব্য করেনি।

বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বন্দর পরিচালনাকারী সংস্থা ডিপি ওয়ার্ল্ড বর্তমানে ৮০টিরও বেশি দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (European Union), জাতিসংঘ (United Nations) এবং বিশ্বব্যাংকের এক যৌথ সমীক্ষা অনুযায়ী, আগামী ১০ বছরে গাজা পুনর্গঠনে প্রয়োজন হবে প্রায় ৭১.৪ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে আগামী ১৮ মাসেই জরুরি ভিত্তিতে দরকার অন্তত ২৩ বিলিয়ন ডলার।

এদিকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। রামাল্লাহর কাছে আল-মুঘায়্যির গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ১৩ বছর বয়সি এক শিশুসহ দুই ফিলিস্তিনি নি’\হত হয়েছেন। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, নির্বিচার গু’\লি চালিয়ে এই হামলায় আরও চারজন গুরুতর আ’\হত হয়েছেন।

একই সঙ্গে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ। গবেষক ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকৃত পশ্চিম তীর থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করতে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীরা যৌন হয়রানি ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারী, পুরুষ এমনকি শিশুদেরও জোরপূর্বক নগ্ন করা, কঠোর দেহ তল্লাশি এবং যৌন সহিংসতার হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে।