সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ঘিরে উত্তেজনা: ইরানের অবস্থান, মার্কিন দাবি আর পারমাণবিক বাস্তবতা

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক থামেনি। নতুন করে বিষয়টি সামনে আসে যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি থামাতে তেহরান তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত হস্তান্তরে রাজি হয়েছে। তবে এই বক্তব্য সরাসরি নাকচ করে দেন ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খতিবজাদেহ। বার্তা সংস্থা এপি-কে তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, এমন কোনো প্রস্তাব ‘একেবারেই অগ্রহণযোগ্য’।

দুই পক্ষ যখন সম্ভাব্য সমঝোতার পথ খুঁজছে, তখন একটি বিষয় স্পষ্ট—সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎই হতে যাচ্ছে আলোচনার কেন্দ্রীয় ইস্যু। কিন্তু এই সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম আসলে কী, কেনই বা তা এত গুরুত্বপূর্ণ?

ইউরেনিয়াম একটি প্রাকৃতিক মৌল, যা পৃথিবীর ভূত্বকে পাওয়া যায়। এটি মূলত দুই ধরনের আইসোটোপ—ইউ-২৩৮ এবং ইউ-২৩৫—দিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ইউ-২৩৮-এর পরিমাণ ৯৯ শতাংশের বেশি, যা সহজে পারমাণবিক বিক্রিয়া ধরে রাখতে পারে না। বিপরীতে ইউ-২৩৫-এর পরিমাণ খুবই কম, প্রায় ০.৭ শতাংশ, কিন্তু এটিই শক্তি উৎপাদনের মূল উপাদান।

এই ইউ-২৩৫-এর পরিমাণ বাড়ানোর প্রক্রিয়াকেই বলা হয় সমৃদ্ধকরণ। শুরুতে ইউরেনিয়ামকে গ্যাসে রূপান্তর করে সেন্ট্রিফিউজে প্রবেশ করানো হয়। দ্রুত ঘূর্ণনের মাধ্যমে ভারী ইউ-২৩৮ কণাগুলো আলাদা হয়ে যায়, আর হালকা ইউ-২৩৫ কেন্দ্রে জমা হয়। এভাবেই ধীরে ধীরে ব্যবহারযোগ্য ইউরেনিয়াম তৈরি করা হয়।

সমৃদ্ধকরণের মাত্রা নির্ধারণ করে ইউরেনিয়ামের ব্যবহার। সাধারণত তিন থেকে পাঁচ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। এটি নিরাপদভাবে নিয়ন্ত্রিত বিক্রিয়া বজায় রাখতে সক্ষম। অন্যদিকে ২০ শতাংশ বা তার বেশি সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম গবেষণায় ব্যবহৃত হলেও, ৯০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছালে সেটি অস্ত্রমানের হয়ে ওঠে। এই পর্যায়ে পৌঁছালে বিক্রিয়া এত দ্রুত ঘটে যে মুহূর্তের মধ্যে বিপুল শক্তি নির্গত হতে পারে।

এখানেই বেসামরিক ও সামরিক ব্যবহারের মৌলিক পার্থক্য। একটি পারমাণবিক চুল্লিতে বিক্রিয়াকে ধীরে ও নিয়ন্ত্রিতভাবে চালানো হয়, যাতে দীর্ঘ সময় ধরে শক্তি উৎপন্ন হয়। কিন্তু অস্ত্রে একই প্রক্রিয়াকে দ্রুত ও নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ঘটানোই লক্ষ্য।

২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র (United States), চীন (China), রাশিয়া (Russia), ফ্রান্স (France), যুক্তরাজ্য (United Kingdom) এবং জার্মানির সঙ্গে করা একটি চুক্তিতে ইরানের সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ করা হয়। সেই চুক্তিতে ইউরেনিয়াম মজুত, সেন্ট্রিফিউজ সংখ্যা এবং ফোর্দো স্থাপনায় কার্যক্রম নিয়েও কড়া বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল।

সমৃদ্ধকরণের মাত্রা যত বাড়ে, পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সম্ভাবনাও তত বাড়ে। বিশেষ করে ২০ শতাংশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমা, কারণ এই পর্যায়ে পৌঁছানোর পর অস্ত্রমানের পর্যায়ে যেতে তুলনামূলক কম সময় ও প্রযুক্তিগত ধাপ প্রয়োজন হয়।

বর্তমানে ইরানের মজুত নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সংঘাত শুরুর সময় তাদের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ছিল। এছাড়া রয়েছে প্রায় ১,০০০ কেজি ২০ শতাংশ এবং ৮,৫০০ কেজি ৩.৬ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম।

ধারণা করা হয়, এই উচ্চমাত্রার ইউরেনিয়ামের বড় অংশ ইসফাহানের একটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় সংরক্ষিত। এটি সেইসব স্থানের একটি, যেগুলো গত বছর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছিল। তবে অন্যান্য স্থানে কী পরিমাণ মজুত আছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

আলোচনায় নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে যখন জানা যায়, ইরান ২০ বছরের জন্য সমৃদ্ধকরণ স্থগিত করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে। তারা বরং পাঁচ বছরের বিরতির প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেছে এবং ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম হস্তান্তরের দাবিও নাকচ করেছে।

আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-এর প্রধান রাফায়েল গ্রোসি সতর্ক করে বলেছেন, এই পরিমাণ ইউরেনিয়াম আরও সমৃদ্ধ করা হলে ১০টি পারমাণবিক বোমা তৈরির মতো সক্ষমতা তৈরি হতে পারে।

তবে ইরান বারবারই দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ। আইএইএ-ও এখন পর্যন্ত সক্রিয় কোনো অস্ত্র কর্মসূচির প্রমাণ পায়নি। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম তৈরি করাই শেষ ধাপ নয়—কার্যকর বোমা তৈরি করতে আরও জটিল প্রযুক্তি ও প্রক্রিয়া প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞ প্যাট্রিসিয়া লুইসের মতে, ২০০৩ সাল পর্যন্ত ইরান কিছু ওয়ারহেড নকশা সক্ষমতা অর্জন করেছিল, যা পরে বন্ধ হয়ে যায়। তবে ২০১৫ সালের চুক্তি ভেঙে পড়ার পর পরিস্থিতি আবারও পরিবর্তিত হতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেন।

২০২৫ সালে মার্কিন ডিফেন্স ইন্টেলিজেন্স এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান খুব দ্রুত—সম্ভবত এক সপ্তাহেরও কম সময়ে—অস্ত্রমানের ইউরেনিয়াম উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে। যদিও একই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান এখনো সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করছে এমন প্রমাণ নেই।

অন্যদিকে ইসরায়েল দাবি করেছে, তাদের কাছে এমন তথ্য রয়েছে যা ইঙ্গিত দেয়—ইরান পারমাণবিক অস্ত্রের উপাদান তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।