রংপুরে সাবেক মেয়রের বিরুদ্ধে জাল সনদ ইস্যুর অভিযোগ, তদন্তে ধীরগতিতে ক্ষোভ

রংপুরের বদরগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহার বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ভারতীয় নাগরিক দুই সহোদরকে অবৈধভাবে বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে জন্মসনদ প্রদান করেন। একই সঙ্গে তাদের মায়ের জন্যও মৃত্যুসনদ ইস্যু করা হয়। বিষয়টি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (Anti-Corruption Commission – ACC)-এ অভিযোগ জমা পড়লেও এখনো দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, এই ঘটনায় পৌরবাসিন্দা প্রদীপ কুমার সাহা (Pradip Kumar Saha) গত বছরের ১২ নভেম্বর দুদকের রংপুর জেলা কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। এর আগে ২০২৩ সালের ২৮ জুন একই ধরনের আরেকটি অভিযোগ করা হয়েছিল। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো অভিযোগেরই যথাযথ তদন্ত হয়নি।

১৯৯৯ সালে বদরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদকে পৌরসভায় উন্নীত করে গেজেট প্রকাশ করা হয় এবং ২০০০ সাল থেকে এর কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের প্রভাববলয়ে উত্তম কুমার সাহা পৌর প্রশাসক থেকে শুরু করে চারবার নির্বাচিত মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তার দায়িত্বকালজুড়ে পৌরসভার বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য এবং আর্থিক দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, ২০১৯ সালে বদরগঞ্জ পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা দেখিয়ে রাজ কুমার নামের এক ব্যক্তির দুই ছেলে—মনোজ কুমার সাহা (রানা) এবং রাজীব কুমার সাহার নামে জন্মসনদ ইস্যু করা হয়। অথচ তাদের জন্ম ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বারাকপুর এলাকায় এবং তারা সেখানকার স্থায়ী বাসিন্দা। অভিযোগ অনুযায়ী, তাদের কাছে ভারতীয় পাসপোর্ট রয়েছে এবং তারা বর্তমানে ভারতেই বসবাস করছেন। এসব তথ্য—ঠিকানা ও মোবাইল নম্বরসহ—দুদকের কাছে জমা দেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।

শুধু জন্মসনদ নয়, তাদের মা আরতী রাণী সাহার মৃত্যুসনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, তিনি ভারতের কলকাতায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। কিন্তু একই তারিখ উল্লেখ করে ২০১৯ সালের ৩১ জানুয়ারি বদরগঞ্জ পৌরসভা থেকে তার নামে মৃত্যুসনদ ইস্যু করা হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এটি পরিকল্পিত জালিয়াতি, যার মাধ্যমে সম্পত্তি সংক্রান্ত কার্যক্রম সহজ করার চেষ্টা হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, রাজ কুমার সাহার বদরগঞ্জ পৌর শহরের কেন্দ্রস্থলে বিপুল পরিমাণ সম্পদ রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য শত কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। এসব সম্পদের মালিকানা নিশ্চিত করতে প্রভাবশালী মহলের সহায়তায় জাল জন্ম ও মৃত্যুসনদ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সাবেক মেয়রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী প্রদীপ কুমার সাহা বলেন, উত্তম কুমার সাহার মেয়াদকালে পৌরসভায় ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে, যা দীর্ঘদিন চাপা ছিল। এখনো তার বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন উঠছে। তিনি আরও দাবি করেন, গোপনে আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে তদন্ত প্রক্রিয়া প্রভাবিত করার চেষ্টাও হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, অভিযোগগুলো প্রমাণিত হলে তা কেবল একটি পৌরসভার প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তা এবং নাগরিক সনদ ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। তারা দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

অভিযোগের বিষয়ে সাবেক মেয়র উত্তম কুমার সাহা বলেন, অভিযুক্তরা ভারতীয় নাগরিক নন। তার দাবি, বদরগঞ্জ ইউনিয়ন থাকা অবস্থায় তৎকালীন চেয়ারম্যান আব্দুল জব্বার সরকার ১৯৯৫ সালে তাদের জন্মসনদ প্রদান করেছিলেন, পরবর্তীতে সেই রেফারেন্সের ভিত্তিতেই পৌরসভা থেকে সনদ দেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় ১৯৯৫ সালের ওই জন্মসনদের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এদিকে দুদকের রংপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. শাওন মিয়া জানিয়েছেন, ঘটনাটি নিয়ে অনুসন্ধান চলছে এবং তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে দীর্ঘ সময়েও দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় স্থানীয়দের মধ্যে হতাশা বাড়ছে।