জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণ প্রকল্পকে ঘিরে একের পর এক অনিয়ম, আর্থিক অসঙ্গতি ও প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ প্রক্রিয়ার অভিযোগ সামনে আসছে। সাবেক সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী (Mostofa Sarwar Farooki)-এর দায়িত্বকালে শত কোটি টাকার এই প্রকল্প আজও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। গত বছরের আগস্টে উদ্বোধনের কথা থাকলেও এখনো সেখানে কাজ চলমান।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের আগেই গোপনে মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি আপ্যায়ন ও নাশতার বিলের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে, যা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিস্মিত করেছে। সম্প্রতি গভীর রাতে ভাইভা নেয়ার একটি ভিডিও প্রকাশের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় উঠে আসে।
মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের আগে গত ২৮ জানুয়ারি এক সপ্তাহের সময় দিয়ে জাদুঘরের বিভিন্ন পদে ৯৬ জন নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। আবেদনের শেষ সময় ছিল ৪ ফেব্রুয়ারি। কিন্তু পাওয়া সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, ২৬ জানুয়ারি থেকেই মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে—যা বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের দুই দিন আগের ঘটনা।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর (Bangladesh National Museum)-এর সুফিয়া কামাল মিলনায়তন ও সিনে কমপ্লেক্সে বিকাল ৫টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চলে এই ভাইভা কার্যক্রম। ২৬ থেকে ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত অন্তত শতাধিক প্রার্থীকে গোপনে পরীক্ষা নেয়া হয়। করিডোরে দেখা যায়, একের পর এক লোক প্রবেশ করছে—কারও হাতে খাম, কারও কাছে কাগজপত্র ভরা ব্যাগ। যাচাই-বাছাই শেষে তাদের ভেতরে পাঠানো হচ্ছিল।
সিনেপ্লেক্সের দায়িত্বে থাকা নাজু মণ্ডল জানান, অফিস সময়ের পরই এসব কার্যক্রম চলত এবং প্রতিদিন ২০-২৫ জন প্রার্থী আসতেন। ছয় দিনে অন্তত শতাধিক লোক ভাইভা দিয়েছেন।
এক প্রার্থী জানান, তিনি ২৭ জানুয়ারি হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা পদে ভাইভা দিয়েছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো লিখিত পরীক্ষা হয়নি, বরং সরাসরি মৌখিক পরীক্ষা নেয়া হয়েছে। পরবর্তীতে বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী আবেদন করতে বলা হয় এবং চাকরি দেয়ার আশ্বাসও দেয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে তা বাস্তবায়িত হয়নি।
আরেকজন প্রার্থী অভিযোগ করেন, চাকরি পাইয়ে দেয়ার জন্য প্রতিজনের কাছ থেকে প্রায় ১৩ লাখ টাকা দাবি করা হয়। জাতীয় জাদুঘরের এক কর্মচারীর মাধ্যমে এই প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল বলে তিনি জানান।
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, ফারুকীর সময় জুলাই জাদুঘরের জন্য ৩০০-৪০০ জন নিয়োগের পরিকল্পনা ছিল, যা আপত্তির মুখে ১০৭ জনে নামানো হয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি (Bangladesh Shilpakala Academy) থেকে তানজিম ইবনে ওয়াহাবকে জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক করা হয় এবং পরে তাকেই অতিরিক্ত দায়িত্ব দেয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, কেনাকাটাতেও বড় ধরনের অনিয়ম হয়েছে। একই কাজের জন্য দুই উৎস থেকে অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। কোনো টেন্ডার ছাড়াই নির্দিষ্ট ভেন্ডার দিয়ে আসবাবপত্র ও গ্যাজেট কেনা হয়েছে এবং বাজার দামের চেয়ে তিন-চার গুণ বেশি বিল দেখানো হয়েছে।
মাত্র ছয় মাসে আপ্যায়ন বাবদ ব্যয় দেখানো হয়েছে ১ কোটি ২ লাখ টাকা। দৈনিক গড়ে প্রায় ৫৬ হাজার টাকা। ২৫ দিনে ভিভিআইপি আপ্যায়ন ও ইন্টারনেট বিল দেখানো হয়েছে প্রায় ৩০ লাখ টাকা। স্বেচ্ছাসেবকদের জন্যও বিপুল ব্যয়ের হিসাব দেয়া হয়েছে।
গত ৬ অক্টোবর আইসেস্কো (ICESCO)-এর মহাপরিচালক ড. সেলিম এম আল মালিক (Dr. Salim M. AlMalik)-এর একদিনের সফরের আপ্যায়ন বিল দেখানো হয়েছে ৭০ হাজার টাকা।
মোহাম্মদপুরের একটি রেস্টুরেন্টের নামে লাখ টাকার খাবারের বিল করা হলেও, রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ জানায় তারা প্রতিদিন ৩০-৩৫ জনের জন্য সাধারণ নাশতা সরবরাহ করতেন, যা কোনোভাবেই লাখ টাকায় পৌঁছায় না।
অন্যদিকে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতে বিপুল অঙ্কের বিল তোলা হয়েছে—লাইট স্থাপনে ৩৮ লাখ টাকা, গ্যালারি সংস্কারে দেড় কোটি টাকা এবং টিনের বাউন্ডারি নির্মাণে ৬৪ লাখ টাকার বেশি।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বর্তমান মহাপরিচালক তানজিম ইবনে ওয়াহাব। তিনি বলেন, এখনো কোনো নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এবং যেসব কার্যক্রম হয়েছে তা কেবল স্বেচ্ছাসেবকদের গাইডিংয়ের অংশ। তার দাবি, কোনো অনিয়ম হয়নি এবং সব অভিযোগ ভিত্তিহীন।
