মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা এবং যুদ্ধ বন্ধের লক্ষ্যে ইরান যে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে, তা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। ইরানের দেয়া তিনটি শর্ত মানতে তার প্রশাসন অনাগ্রহী বলেই জানা গেছে।
অনলাইন এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, সপ্তাহান্তে তেহরান ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব তুলে ধরে। এতে বলা হয়—যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর আরোপিত অর্থনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে, দেশটির বন্দরগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে হবে এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে। এই শর্তগুলো পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেয়া হবে বলে জানায় ইরান।
তেহরান আরও ইঙ্গিত দেয়, পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা তাৎক্ষণিকভাবে নয়, বরং পরবর্তী কূটনৈতিক ধাপে নেয়া যেতে পারে। এই অবস্থানই মূলত ওয়াশিংটনের আপত্তির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি (Abbas Araghchi) ওমান ও পাকিস্তানে আলোচনাকারীদের সঙ্গে বৈঠকে এই প্রস্তাব তুলে ধরেন। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অচলাবস্থা কাটিয়ে আলোচনার নতুন পথ খুলতেই এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল।
তবে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে এই প্রস্তাব নিয়ে সন্দেহ প্রবল। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসকে দেয়া কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, ট্রাম্প ও তার জাতীয় নিরাপত্তা টিম এখনো নিশ্চিত নন যে এই প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য কি না। বিশেষ করে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা পিছিয়ে দেয়ার বিষয়টি বড় ধরনের আপত্তির জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন বরাবরই কঠোর অবস্থানে থেকেছে যে, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেয়া যাবে না। এই অবস্থানকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও (Marco Rubio) স্পষ্ট জানিয়েছেন, এমন কোনো চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয় যেখানে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত থাকবে না। ফক্স নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমরা তাদের এভাবে পার পেতে দিতে পারি না। যে কোনো চুক্তি এমন হতে হবে যাতে তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্রের দিকে এগোতে না পারে।”
হোয়াইট হাউস এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের প্রস্তাব নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকবে। এর আগে ট্রাম্প সরাসরি ফোনে আলোচনার প্রস্তাবও দিয়েছিলেন।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস এক বিবৃতিতে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র গণমাধ্যমের মাধ্যমে আলোচনা করবে না। “আমাদের লাল রেখা স্পষ্ট, এবং প্রেসিডেন্ট এমন চুক্তিই করবেন যা আমেরিকার জনগণ ও বিশ্বের জন্য উপকারী,”—যোগ করেন তিনি।
ইরানের শর্তগুলো স্পষ্টভাবে তিনটি বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে—অবরোধ প্রত্যাহার, বন্দর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ বন্ধ করা। এই শর্ত পূরণ হলেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে তেহরান।
তবে এই প্রস্তাবকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে তীব্র মতভেদ তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—যুক্তরাষ্ট্র নাকি ইরান, কে বেশি প্রভাবশালী অবস্থানে আছে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক চাপ সহ্য করার সক্ষমতা কার বেশি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, ইরানের নেতৃত্ব এখনো তাদের আলোচকদের পারমাণবিক ইস্যুতে ছাড় দেয়ার অনুমতি দেয়নি, যা সম্ভাব্য শান্তি চুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ে ট্রাম্প নিজেও হতাশা প্রকাশ করেছেন।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে তিনি লেখেন, “ইরান এখনো ঠিক করতে পারছে না, তাদের নেতা কে! তারা কিছুই বুঝতে পারছে না!” একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, কট্টরপন্থীরা যুদ্ধক্ষেত্রে খারাপভাবে পিছিয়ে পড়ছে এবং তথাকথিত মধ্যপন্থীরাও পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়।
এই প্রেক্ষাপটে হরমুজ প্রণালি ঘিরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপই বৈশ্বিক জ্বালানি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


