কল্পবিজ্ঞানের গল্প নয়—বাস্তবেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে প্রথমবারের মতো আকাশে উড়েছে বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সি। পরীক্ষামূলক এই ফ্লাইট ইতোমধ্যেই নগর পরিবহনের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ম্যানহাটন থেকে জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট পর্যন্ত পরিচালিত এই উড্ডয়নকে নিয়মিত যাতায়াত ব্যবস্থার অংশ করার সম্ভাবনা দেখছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বৈদ্যুতিক উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান জোবি এভিয়েশন (Joby Aviation) গত শুক্রবার পরীক্ষামূলকভাবে এই ফ্লাইট পরিচালনা করে। শুধু একদিনেই থেমে থাকেনি তারা—পুরো সপ্তাহজুড়ে চলছে ধারাবাহিক পরীক্ষা। এই নতুন প্রযুক্তির উড়োজাহাজকে বলা হয় ইলেকট্রিক ভার্টিক্যাল টেকঅফ অ্যান্ড ল্যান্ডিং (ইভিটিওএল)। দেখতে অনেকটা বড় আকারের ব্যাটারি চালিত ড্রোনের মতো হলেও এটি বহন করতে পারে একজন পাইলটসহ মোট পাঁচজন যাত্রী।
এই উড়োজাহাজের বিশেষত্ব এর উড্ডয়ন প্রক্রিয়ায়। হেলিকপ্টারের মতো উল্লম্বভাবে আকাশে উঠতে পারে এটি, এরপর প্রপেলারের কোণ বদলে সামনের দিকে গতি নেয়। কোম্পানির দাবি, এটি প্রচলিত হেলিকপ্টারের তুলনায় অনেক কম শব্দ করে এবং সম্পূর্ণ বৈদ্যুতিক হওয়ায় এতে কার্বন নির্গমন নেই বললেই চলে। ফলে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার দিকে এটি একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো ম্যানহাটন (Manhattan)-এর লোয়ার ও মিডটাউন এলাকার হেলিপোর্টগুলোকে জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (JFK International Airport)-এর সঙ্গে যুক্ত করা। বর্তমানে এই পথ পাড়ি দিতে সড়কপথে এক থেকে দুই ঘণ্টা পর্যন্ত সময় লাগে। কিন্তু এয়ার ট্যাক্সি চালু হলে সেই সময় কমে দাঁড়াতে পারে ১০ মিনিটেরও নিচে—যা নগর জীবনের গতিকে আমূল বদলে দিতে পারে।
নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির পোর্ট অথরিটি (Port Authority of New York and New Jersey)-এর চেয়ারম্যান কেভিন ও’টুল বলেন, এই পরীক্ষামূলক ফ্লাইটগুলো আমাদের বুঝতে সহায়তা করবে ভবিষ্যতের এই প্রযুক্তি কীভাবে নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সির মানুষের কাজে লাগতে পারে। তার মতে, এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত পরীক্ষা নয়, বরং নগর পরিবহনের সম্ভাব্য রূপান্তরের সূচনা।
জোবি এভিয়েশন ইতোমধ্যেই হেলিকপ্টার রাইড-শেয়ার কোম্পানি ব্লেড-এর মালিকানা অর্জন করেছে। পাশাপাশি তাদের অংশীদারিত্ব রয়েছে ডেল্টা এয়ার লাইনস (Delta Air Lines) এবং উবার (Uber)-এর মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে, যা এই উদ্যোগকে আরও বাণিজ্যিকভাবে শক্তিশালী করে তুলছে।
২০২৩ সাল থেকেই জোবি এভিয়েশন বিভিন্ন পরীক্ষামূলক ফ্লাইট পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে চলমান ১০ দিনের এই ফ্লাইট কার্যক্রমটি যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল এভিয়েশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ইভিটিওএল ইন্টিগ্রেশন পাইলট প্রোগ্রামের অংশ। এর আগে গত মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবহন বিভাগ (U.S. Department of Transportation) আটটি পাইলট প্রকল্প নির্বাচন করে, যেখানে এই প্রযুক্তির বাস্তব প্রয়োগ পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পে শহুরে এয়ার ট্যাক্সি, আঞ্চলিক যাত্রী পরিবহন, কার্গো পরিবহন, জরুরি সেবা এবং স্বয়ংক্রিয় ফ্লাইট অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সব মিলিয়ে, নিউইয়র্কের আকাশে এই বৈদ্যুতিক এয়ার ট্যাক্সির উড্ডয়ন শুধু একটি প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়—বরং ভবিষ্যতের শহুরে যাতায়াত ব্যবস্থার এক ঝলক, যেখানে সময়, পরিবেশ এবং দক্ষতার নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে।


