রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডিং শুরু—পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক যাত্রা

দীর্ঘ এক দশকের নিরলস প্রচেষ্টা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জটিল কারিগরি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ অবশেষে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজাত পরিসরে প্রবেশ করল। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র (Rooppur Nuclear Power Plant)-এর প্রথম ইউনিটে জ্বালানি হিসেবে ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রম শুরু হয়েছে—যা দেশের জ্বালানি ইতিহাসে এক মাইলফলক।

গত ১৬ এপ্রিল পরমাণু চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের আনুষ্ঠানিক লাইসেন্স বা কমিশনিং অনুমোদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে আজ এই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের সীমিত সংখ্যক পারমাণবিক শক্তিধর দেশের তালিকায় নিজেদের অবস্থান নিশ্চিত করল বাংলাদেশ।

কারিগরি জটিলতা ও প্রস্তুতির দীর্ঘ পথ
আন্তর্জাতিক গাইডলাইন ও কঠোর নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করতে গিয়ে জ্বালানি লোডিংয়ের সময়সূচি একাধিকবার পিছিয়েছে। তবে শেষ পর্যন্ত সব শর্ত পূরণ করে প্রথম ইউনিটকে জ্বালানি গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। এই সংবেদনশীল প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে ৫৯ জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ বিশেষ অপারেটিং লাইসেন্স অর্জন করেছেন, যারা সরাসরি এই কার্যক্রম পরিচালনায় যুক্ত রয়েছেন।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, জ্বালানি লোডিংয়ের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। তিনি আরও বলেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী জুলাইয়ের শেষ কিংবা আগস্টের শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হবে।

পূর্ণ সক্ষমতার অপেক্ষা
তবে পূর্ণমাত্রায় বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে চলতি বছরের শেষ কিংবা আগামী বছরের শুরু পর্যন্ত। তখন প্রথম ইউনিট থেকেই এককভাবে ১২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে—যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বড় অবদান রাখবে।

১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের এই মেগাপ্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে রোসাটম (Rosatom)-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায়। এতে ব্যবহৃত হয়েছে অত্যাধুনিক ‘ভিভিইআর-১২০০’ মডেলের দুটি রিয়্যাক্টর। প্রকল্পের পূর্ণ বাস্তবায়ন শেষে দুই ইউনিট মিলিয়ে মোট ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে—যা দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করতে সক্ষম বলে আশা করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক উপস্থিতিতে উদ্বোধন
এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু শক্তি সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ ১৮ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকা সফর করেন। তিনি রাজধানীতে পৌঁছে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)-এর সঙ্গে বৈঠক করেন। বৈঠকে প্রকল্পের অগ্রগতি ও দুই দেশের পারমাণবিক সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়।

পরবর্তীতে তিনি হেলিকপ্টারযোগে প্রকল্প এলাকায় পৌঁছে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অংশ নেন। অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (Ministry of Science and Technology)-এর মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামসহ বাংলাদেশ ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাদের উপস্থিতিতেই ইউরেনিয়াম লোডিং কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়।

এই পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে শুধু একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, বরং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক অবস্থান—সবকিছুরই এক নতুন অধ্যায় শুরু হলো।