কিয়েভ ছাড়ছেন জুলি ডেভিস: সংকটময় সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক শূন্যতা আরও ঘনীভূত

ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে দায়িত্ব পালনরত ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রদূত জুলি ডেভিস (Julie Davis) শিগগিরই তার পদ ছাড়ছেন—এমন খবর সামনে আসতেই নতুন করে আলোচনায় উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক অবস্থান। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, তার এই বিদায়ের ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পদ শূন্য হয়ে পড়বে, এমন এক সময়ে যখন ইউক্রেন (Ukraine) যুদ্ধের গতি নতুন মোড় নিতে যাচ্ছে।

অনলাইন ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (Financial Times) জানিয়েছে, ডেভিস গত বছরের মে মাস থেকে কিয়েভ (Kyiv)-এ যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে অস্থায়ী চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর সঙ্গে ইউক্রেন নীতিতে মতবিরোধ তাকে ক্রমশ হতাশ করে তোলে। এ বিষয়ে অবগত তিনটি সূত্র এমনটাই দাবি করেছে।

ডেভিসের এই বিদায় তার পূর্বসূরি ব্রিজেট ব্রিঙ্কের পদত্যাগের ধারাবাহিকতাতেই ঘটছে। ব্রিঙ্কও একই ধরনের নীতিগত দ্বন্দ্বের জেরে দায়িত্ব ছাড়েন গত বছরের এপ্রিলে। ফলে কিয়েভে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন আরও গভীর হয়েছে।

সূত্র মতে, ডেভিস সম্প্রতি স্টেট ডিপার্টমেন্টকে তার বিদায়ের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন। প্রায় তিন দশকের দীর্ঘ কূটনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ করে অবসরে যাওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে তার। যদিও তিনি একইসঙ্গে সাইপ্রাসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন, কিয়েভের দায়িত্বও সমান্তরালে সামলাচ্ছিলেন। তবে গত অক্টোবর মাসে এক অপ্রত্যাশিত ঘটনার মুখোমুখি হন—গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পারেন, ট্রাম্প অ্যারিজোনার ব্যবসায়ী জন ব্রেসলোকে সাইপ্রাসে রাষ্ট্রদূত হিসেবে মনোনয়ন দিয়েছেন, যা তাকে আগে জানানো হয়নি।

এদিকে স্টেট ডিপার্টমেন্টের মুখপাত্র টমি পিগট ডেভিসের পদত্যাগের পেছনে মতবিরোধের বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ডেভিস ট্রাম্প প্রশাসনের শান্তি উদ্যোগের একজন দৃঢ় সমর্থক ছিলেন এবং জুন ২০২৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করে অবসর নেয়ার পরিকল্পনা নিয়েছেন।

তবে বাস্তবতা বলছে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় কিয়েভে স্থায়ী রাষ্ট্রদূত ধরে রাখা বরাবরই চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। ২০১৯ সালে ট্রাম্প তৎকালীন রাষ্ট্রদূত মেরি ইয়োভানোভিচকে হঠাৎ প্রত্যাহার করেন, যিনি পরে তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য দেন। এরপর ব্রিঙ্কের পদত্যাগ, আর এখন ডেভিসের বিদায়—সব মিলিয়ে কূটনৈতিক অস্থিরতা যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

ব্রিঙ্কের পদত্যাগের পেছনে বড় কারণ ছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ওভাল অফিসে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি (Volodymyr Zelenskyy)-এর বিরুদ্ধে ট্রাম্পের মৌখিক আক্রমণ। ওই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র কয়েক সপ্তাহের জন্য কিয়েভের সঙ্গে সামরিক সহায়তা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় স্থগিত রাখে।

বর্তমানে ব্রিঙ্ক মিশিগানে প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে ডেমোক্রেট প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এবং তার প্রচারণায় ট্রাম্পের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin)-কে প্রশ্রয় দেয়ার অভিযোগ তুলছেন।

ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউস অনেক ক্ষেত্রেই স্টেট ডিপার্টমেন্টকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি নিজের ঘনিষ্ঠদের মাধ্যমে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করছে। বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জারেড কুশনারের মতো ব্যক্তিদের হাতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানও রয়েছে। তবে রাশিয়ার অনড় অবস্থান এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে শান্তি আলোচনা কার্যত থমকে গেছে।

এই প্রেক্ষাপটে ইউক্রেনের গোয়েন্দা সূত্রগুলো জানিয়েছে, মস্কো গ্রীষ্মকালীন নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।

একইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে, ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে রাষ্ট্রদূত ফিরিয়ে এনে দূতাবাসগুলোকে “আমেরিকা ফার্স্ট” নীতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে চাইছে। ফলে বর্তমানে বহু গুরুত্বপূর্ণ দেশে সিনেট অনুমোদিত রাষ্ট্রদূত নেই—যার মধ্যে ইউক্রেনও রয়েছে।

এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সিনেটের পররাষ্ট্র সম্পর্ক কমিটির শীর্ষ ডেমোক্রেট সিনেটর জিন শাহিন। তিনি ডেভিসের নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, কিয়েভের মতো গুরুত্বপূর্ণ পোস্ট অস্থায়ী ব্যবস্থায় পরিচালনা করা উচিত নয়—যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেন উভয়ের স্বার্থেই স্থায়ী রাষ্ট্রদূত নিয়োগ জরুরি।

বর্তমান ও সাবেক কূটনীতিকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময়ে ইউক্রেন বিশেষজ্ঞদের একটি বড় অংশ হয় অবসর নিয়েছেন, না হয় চাকরি ছেড়েছেন বা হারিয়েছেন। এতে করে যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।