কঠোর শর্তে ১.৯ বিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন, বাজেট সহায়তায় বড় অংশ

উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর কাছ থেকে মোট ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারের পাঁচটি ঋণ প্রস্তাবে অনুমোদন দিয়েছে সরকার, যার বড় একটি অংশই কঠোর শর্তযুক্ত ‘নন-কনসেশনাল’ ঋণ। এর মধ্যে প্রায় ১ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলারই অনমনীয় ঋণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনুমোদিত অর্থের মধ্যে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা হিসেবে ব্যবহার করা হবে, যা চলমান আর্থিক চাপ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে সরকার।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত নন-কনসেশনাল ঋণসংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব ঋণের অনুমোদন দেওয়া হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী (Amir Khosru Mahmud Chowdhury)।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বাজেট সহায়তার আওতায় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (Asian Development Bank – ADB) থেকে ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (JICA) থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (AIIB) থেকে ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (OPEC Fund) থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার পাওয়া যাবে।

ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব ঋণের সুদহার তুলনামূলক বেশি, গ্রেস পিরিয়ড কম এবং পরিশোধ সময়সীমাও অপেক্ষাকৃত স্বল্প হওয়ায় এগুলোকে অনমনীয় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

‘স্ট্রেংদেনিং ইকোনমিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড গভর্ন্যান্স, সাবপ্রোগ্রাম-২’ শীর্ষক কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশকে মোট ৭৫০ মিলিয়ন ডলার দেবে এডিবি। এর মধ্যে ৩০০ মিলিয়ন ডলার কনসেশনাল ঋণ হিসেবে থাকছে, যেখানে সুদহার ২ শতাংশ, পরিশোধকাল ২৫ বছর এবং ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। অন্যদিকে বাকি ৪৫০ মিলিয়ন ডলার এডিবির অর্ডিনারি ক্যাপিটাল রিসোর্সেস (ওসিআর) থেকে দেওয়া হবে, যা কঠোর শর্তের আওতায় পড়ছে। একই কর্মসূচিতে সহ-অর্থায়নকারী হিসেবে এআইআইবি দেবে আরও ২৫০ মিলিয়ন ডলার, যা অত্যন্ত অনমনীয় ঋণ হিসেবে চিহ্নিত।

তাৎক্ষণিক রাজস্ব চাপ সামাল দিতে জাইকার কাছ থেকে ৫০০ মিলিয়ন ডলার নেওয়া হচ্ছে। সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (International Monetary Fund – IMF)-এর সুপারিশ অনুযায়ী সামাজিক সুরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধি, রাজস্ব প্রশাসন শক্তিশালী করা এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা আনতে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। পাশাপাশি ওপেক ফান্ডের ১০০ মিলিয়ন ডলারও একই সহায়তা প্যাকেজে যুক্ত হয়েছে।

কর্মকর্তারা জানান, জাইকার ঋণে সুদহার প্রায় ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ, পরিশোধকাল ৩০ বছর এবং ১০ বছরের গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে। এআইআইবির ঋণে সুদহার প্রায় ৫ দশমিক ০৮ শতাংশ, মেয়াদ ৩৫ বছর এবং ৫ বছরের গ্রেস পিরিয়ড। অন্যদিকে ওপেক ফান্ডের ঋণে সুদহার প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ, মেয়াদ ১৮ বছর এবং গ্রেস পিরিয়ড ৩ বছর।

বাজেট সহায়তার বাইরে, ঢাকা-কাঁচপুর থেকে সিলেট পর্যন্ত প্রায় ২১০ কিলোমিটার মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে ‘সাসেক ঢাকা-সিলেট করিডোর সড়ক বিনিয়োগ (ট্রাঞ্চ-২)’ প্রকল্পের জন্য এডিবির আরও ৩০০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা, যার মধ্যে সরকার দেবে ৩ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকা এবং এডিবি দেবে ১৩ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা।

বৈদেশিক ঋণ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করতে সভায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কনসেশনাল ঋণ পাওয়া সম্ভব না হলে তবেই নন-কনসেশনাল ঋণ গ্রহণ করা হবে। একইসঙ্গে ঋণগ্রহীতাদের নিজস্ব আয়ের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা থাকতে হবে।

এছাড়া অনমনীয় বৈদেশিক ঋণের বার্ষিক পরিশোধ ব্যয় রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ বা সরকারি রাজস্বের ১৫ শতাংশ—এই দুইয়ের মধ্যে যেটি কম, সেই সীমার মধ্যে রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। পাশাপাশি মোট অনমনীয় বৈদেশিক দায় জিডিপির ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।