চলমান ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয়ের দাবির বিপরীতে এবার উঠে এলো ভিন্ন এক চিত্র। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক বিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম ধ্বংস হয়েছে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (Center for Strategic and International Studies – CSIS)-এর হিসাব অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ২.৩ বিলিয়ন থেকে ২.৮ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম নষ্ট হয়েছে। এই তথ্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা (Al Jazeera)।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৬ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর উপস্থিতিতে এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেছিলেন, ইরানকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে ‘নিষ্ক্রিয়’ করা হয়েছে। কিন্তু সেই দাবির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় প্রায় ৭০ কোটি ডলার মূল্যের একটি ই-৩ আওয়াকস রাডার বিমান ধ্বংস হয়—যা পরিস্থিতির ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে।
এই ক্ষয়ক্ষতির বিস্তারিত হিসাব তৈরি করেছেন সিএসআইএস-এর জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা মার্ক ক্যানসিয়ান। তার বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ধ্বংস হওয়া সরঞ্জামের মধ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা রাডার, যার মূল্য আনুমানিক ৪৮ কোটি থেকে ৯৭ কোটি ডলার। এছাড়া মার্চের শুরুতে কুয়েতে ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’-এর ঘটনায় তিনটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ওমর আশুর মনে করেন, এই ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ চিত্র রাজনৈতিক কারণে প্রকাশ করা হচ্ছে না। তার মতে, ট্রাম্প প্রশাসন সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রভাবের কথা বিবেচনায় রেখে তথ্য আড়াল করতে পারে। বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনের আগে বড় ধরনের ক্ষতির খবর জনসমক্ষে এলে তা রাজনৈতিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি অতীতের উদাহরণ টেনে বলেন, ভিয়েতনাম ও আফগানিস্তানের যুদ্ধেও শুরুতে বড় জয়ের দাবি করেছিল যুক্তরাষ্ট্র, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেসব অভিযানে কৌশলগতভাবে ব্যর্থতার মুখে পড়তে হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন (Pentagon)-এর অনুরোধে গ্লোবাল স্যাটেলাইট ইমেজ সরবরাহকারী প্ল্যানেট ল্যাবস (Planet Labs) গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর স্যাটেলাইট ছবি জনসাধারণের জন্য বন্ধ করে দিয়েছে। তবে ইরানি স্যাটেলাইট সূত্র থেকে পাওয়া ছবিতে এসব ঘাঁটিতে উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
মার্ক ক্যানসিয়ানের বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছিল না, যার ফলে হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়নি। বর্তমানে সেখানে অতিরিক্ত নৌশক্তি মোতায়েন করা হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি।
অন্যদিকে, মার্কিন-ইসরাইলি হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক অবকাঠামো কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা এখনো কার্যকর রয়েছে, যা এই সংঘাতকে দীর্ঘস্থায়ী করার সম্ভাবনা তৈরি করছে।


