অভিষেকের উত্থানেই কি ভাঙল মমতার ‘মিডল অর্ডার’, তৃণমূলের পতনের নেপথ্যে নবীন-প্রবীণ টানাপড়েন

২০১১ সালের ২১ জুলাই। মাত্র দু’মাস আগেই ৩৪ বছরের বামদুর্গ যেন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকার গড়ে ব্রিগেডের মঞ্চে ‘শ’\হীদ দিবস’ পালন করেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। সেই মঞ্চেই তৃণমূলের রাজনীতিতে কার্যত ‘অভিষেক’ ঘটে আর এক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। খবর আনন্দবাজার অনলাইনের।

সে দিন ২৪ বছরের তরুণ নেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee)-কে অধিকাংশ মানুষ চিনতেন মমতার ভ্রাতুষ্পুত্র হিসেবেই। কিন্তু সময় যত এগিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর অন্দরে তার ক্ষমতাও তত বেড়েছে। একই সঙ্গে ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে দলের ভিতরের নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব। ১৫ বছর পরে দল যখন ক্ষমতাচ্যুত, তখন সেই পরাজয়ের ময়নাতদন্তে অনেকেই বলছেন, মমতার তৈরি শক্তিশালী ‘মিডল অর্ডার’-এর ভাঙনের বীজ আসলে সেখানেই লুকিয়ে ছিল। নবীন ও প্রবীণ নেতৃত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে না পারাই শেষ পর্যন্ত দুর্গপতনকে প্রায় অনিবার্য করে তুলেছিল।

১৯৯৮ সালের ১ জানুয়ারি তৃণমূলের পথচলা শুরু। মমতার সঙ্গে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন মুকুল রায়, জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত বক্সী, মদন মিত্র, পার্থ চট্টোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিমরা। পরে যোগ দেন শিশির অধিকারী ও শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। বাম সরকারের বিরুদ্ধে টানা এক দশকের লড়াইয়ে এই নেতাদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতায় আসার পরও তারা দলে ও সরকারে দাপটের সঙ্গে কাজ করেছেন। মমতার অধীনে তারাই ছিলেন তৃণমূলের সেই ‘মিডল অর্ডার’, যাদের ব্যাটে ভর করেই নেত্রী একের পর এক রাজনৈতিক বল বাউন্ডারির বাইরে পাঠিয়েছেন।

কিন্তু ২০২৬ সালে এসে তৃণমূলের মুখ থুবড়ে পড়ার নেপথ্যে সেই মিডল অর্ডারের অপ্রাসঙ্গিকতাকেই বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেউ দল ছেড়েছেন, কেউ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারেননি। কেউ কেউ নতুনদের সঙ্গে সমঝোতা করে দলে টিকে থাকলেও গুরুত্ব হারিয়েছেন। মমতার রাজনীতিতে একসময় ‘কর্পোরেট’ সংস্কৃতির বদলে ছিল ‘খোলা হাওয়া’। মুড়ি-তেলেভাজার দল যখন ধীরে ধীরে ফিশফ্রাইয়ের দলে বদলাতে শুরু করল, তখন মুড়ি-তেলেভাজার নেতারাও ক্রমে কোণঠাসা হয়ে পড়লেন। ক্ষমতা সরে গেল অন্য বৃত্তে।

শুরু থেকেই যাঁরা লড়াইয়ে সঙ্গ দিয়েছেন, মমতা তাদের গুরুত্ব দিতেন। তৃণমূল গড়ার পরে বেশির ভাগ জেলায় সভাপতি করেছিলেন সেই সব নেতাদের, যারা তার যুব কংগ্রেস পর্বে জেলার যুব সভাপতি ছিলেন। হাওড়ায় অরূপ রায়, কোচবিহারে রবীন্দ্রনাথ ঘোষ, হুগলিতে আকবর আলি খন্দকার, উত্তর ২৪ পরগনায় জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক—এমন উদাহরণ কম নয়। কলকাতায় যুব কংগ্রেস নেতা হিসেবে ফিরহাদ ও মদনরাও গুরুত্ব পেয়েছিলেন। ক্ষমতায় আসার পর দীর্ঘ সময় এই ঘনিষ্ঠ বৃত্তই সরকার ও সংগঠনের কেন্দ্রে ছিল। কিন্তু ২০১৬-’১৭ সাল থেকে সেই গুরুত্ব কমতে শুরু করে। ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে রাজনীতিকে মিশিয়ে ফেলার অভিযোগে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রকাশ্যে শোভন চট্টোপাধ্যায়কে তিরস্কার করেছিলেন মমতা। জানতে চেয়েছিলেন, শোভন পার্টি করতে চান, না ‘প্রেম’ করতে চান। তার কিছু পরেই ২০১৮ সালে দল ছাড়েন শোভন। মেয়র ও মন্ত্রিত্ব থেকেও ইস্তফা দেন। পরে বিজেপিতে গেলেও স্বস্তি পাননি। সম্প্রতি তৃণমূলে ফিরলেও আগের সেই গুরুত্ব আর ফিরে পাননি।

২০১১ সালে অভিষেক তৃণমূল রাজনীতিতে প্রবেশের পরে ‘যুবা’ নামে একটি সংগঠন তৈরি হয়। তিনি ছিলেন সেই সংগঠনের সভাপতি। তখনও তৃণমূলের যুব সংগঠন আলাদা ভাবে ছিল, যার নেতৃত্বে ছিলেন শুভেন্দু। অনেকের মতে, সেই সময় থেকেই অভিষেক-শুভেন্দু সংঘাতের ভিত তৈরি হয়। পরে অভিষেক যুব সংগঠনের সভাপতি হলে ‘যুবার’ আলাদা অস্তিত্ব আর থাকেনি। ধীরে ধীরে দলের ক্ষমতার শীর্ষে উঠতে থাকেন অভিষেক। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে তাকে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক করা হয়। যদিও তার আগেই দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে অলিখিত পরিচিতি পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি।

অভিষেক বারবার ‘নতুন তৃণমূল’-এর কথা বলেছেন। সংগঠন নিয়ে নতুন ভাবনার কথা প্রকাশ্যে এনেছেন। ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নীতি চালুর পক্ষে ছিলেন তিনি। তখন প্রথম যে নামটি আলোচনায় আসে, তা ফিরহাদ হাকিম। তিনি একসঙ্গে মন্ত্রী ও মেয়রের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন। কিন্তু মমতার ঘনিষ্ঠ ও আস্থাভাজন ফিরহাদ শেষ পর্যন্ত দুই পদেই থেকে যান। অভিষেক বয়সবিধি চালুর কথাও বলেছিলেন। তার মতে, রাজনীতিতে অবসরের বয়স থাকা উচিত, এবং তা ৬৫ বছরের বেশি হওয়া উচিত নয়। তবে মমতাকে তিনি ব্যতিক্রম বলেছিলেন। এই ভাবনাও তৃণমূলে পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রবীণদের রেখেই নতুনদের জায়গা করতে হয়েছে। কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছেন, কেউ মানিয়ে নিয়েছেন।

তৃণমূলের সংগঠনকে শুরু থেকে শক্ত হাতে ধরে রেখেছিলেন মুকুল রায় (Mukul Roy)। সংগঠনের নাড়ি-নক্ষত্র ছিল তার হাতে। বলা হত, মমতা সরকার চালান, মুকুল দল চালান। ব্লক স্তরের নেতাদের নামও তার জানা ছিল। ভোটের সময় মানচিত্র নিয়ে ঘুরতেন; সবুজ, হলুদ, লাল রঙে আসন চিহ্নিত থাকত। সবুজ মানে জয় নিশ্চিত, হলুদ মানে অনিশ্চয়তা, লাল মানে পরাজয়ের সম্ভাবনা। অনেক ক্ষেত্রেই তার হিসাব মিলে যেত। কিন্তু শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে টানাপড়েনের জেরে ২০১৭ সালে তিনি দল ছাড়েন, পরে বিজেপিতে যোগ দেন। অনেকের মতে, তৃণমূলের সংগঠনে সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল মুকুলের দলত্যাগ। পরে তিনি তৃণমূলে ফিরলেও তখন তিনি যেন আগের মুকুলের ছায়া মাত্র।

২০১৯ সাল থেকেই শুভেন্দুর মধ্যে অভিষেক-বিরোধিতা প্রকট হচ্ছিল। ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তিনি বিজেপিতে যোগ দেন। তার আগে তৃণমূলে ‘সাংগঠনিক সংস্কার’ হয়েছিল। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে পরামর্শদাতা সংস্থা হিসেবে তৃণমূলের সঙ্গে যুক্ত হয় আই-প্যাক (I-PAC)। এরপরই জেলা পর্যবেক্ষক পদ তুলে দেওয়া হয়। ফিরহাদ, অরূপ বিশ্বাস, শুভেন্দুর মতো নেতারা বিভিন্ন জেলায় পর্যবেক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। পদটি উঠে যাওয়ায় দলের ভিতরে চাপা ক্ষোভ তৈরি হয়। অনেকের মনে হয়েছিল, মমতাকে ঘিরে থাকা পুরনো বৃত্তের কাজের জায়গা সংকুচিত হচ্ছে, ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হচ্ছে। যদিও অভিষেকের দাবি ছিল, শুভেন্দুর ‘মতিগতি’ বুঝেই ওই পদক্ষেপ করা হয়েছিল।

অভিষেকের সাংগঠনিক ক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি তৃণমূলে ডালপালা মেলেছিল আই-প্যাক। সংগঠনে ঢুকে পড়ে কর্পোরেট ঘরানা। ক্যামাক স্ট্রিটের অভিষেক-ঘনিষ্ঠ দফতর বরাবর আই-প্যাকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কাজ করেছে। কিন্তু শুরুতে অনেকেই তা মেনে নিতে পারেননি। কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মদন মিত্রের মতো নেতারা প্রকাশ্যেই আপত্তি জানিয়েছিলেন। সুব্রত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, এত দিন রাজনীতি করার পরে এখন বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েরা সাংবাদিক বৈঠকের আগে হাতে কাগজ ধরিয়ে দেবে, আর সেই কাগজ দেখে মুখস্থ বলতে হবে? তবে সময়ের সঙ্গে অনেককেই সেই নতুন সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয়। যারা পারেননি, তারা ছিটকে গিয়েছেন।

ট্যাক্সি ইউনিয়ন থেকে উঠে আসা মদন থেকে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে ‘ডুবে’ যাওয়া পার্থ—মমতার চোখের সামনেই একের পর এক ‘উইকেট’ পড়েছে। অভিষেকের নেতৃত্ব সেই শূন্যস্থান পূরণ করতে পারেনি। নতুন তৃণমূলে নতুন কোনও শক্তিশালী ‘মিডল অর্ডার’ও তৈরি হয়নি। উল্টে শুভেন্দু দল ছেড়ে বিজেপিকে শক্তিশালী করেছেন। নন্দীগ্রামে ভোটের লড়াইয়ে খোদ মমতাকেও হারিয়েছেন। শোভন ফিরলেও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছেন। মদনের গুরুত্ব কমেছে। সুব্রত বক্সী রাজ্য সভাপতি হলেও আগের মতো দৃপ্ত নন। গরু পাচার মামলায় নাম জড়ানোর পর বীরভূমে ধারাবাহিক ভাবে অনুব্রত মণ্ডলের দাপট কমেছে। শোভনদেব, অরূপ, ববিরা শেষ পর্যন্ত টিকে থাকলেও মমতার সঙ্গে আগের বোঝাপড়ার যে দাপট ছিল, তা আর দীর্ঘ দিন দেখা যায়নি।

ছোট-বড় বহু ক্ষত তৃণমূলকে ধীরে ধীরে পতনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ বা ‘যুবসাথী’র মতো প্রকল্প মানুষকে আকৃষ্ট করলেও সংগঠনের ভিতরের ক্ষতে প্রলেপ দিতে পারেনি। দলের অনেকের মতে, মিডল অর্ডার ভেঙে পড়ায় পুরো ব্যাটিং অর্ডারই রক্তশূন্য হয়ে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ম্যাচ হেরে তারই খেসারত দিতে হল তৃণমূলকে।