রাজধানীর মহাখালীর সরকারি তিতুমীর কলেজ (Government Titumir College) ক্যাম্পাসে গভীর রাতে দেখা গেল অস্বাভাবিক এক দৃশ্য—ছাত্রীনিবাসের গেট পেরিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন নারী শিক্ষার্থীরা। মুহূর্তেই চারপাশ মুখর হয়ে ওঠে স্লোগানে—“হল কারো বাপের না, ছাত্ররাজনীতি চলবে না”, “প্রশাসনের কালো হাত, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও”।
মঙ্গলবার (৫ মে) রাতের এই বিক্ষোভ যেন জমে থাকা ক্ষোভের হঠাৎ বিস্ফোরণ। দীর্ঘদিনের অস্বস্তি, অনিশ্চয়তা আর অভিযোগ একসঙ্গে সামনে চলে আসে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সম্প্রতি কলেজের আবাসিক হলগুলোতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল (Bangladesh Jatiyatabadi Chhatra Dal)-এর একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণার পর থেকেই পরিস্থিতি অস্বস্তিকর হয়ে ওঠে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটি অংশ মনে করছে, এর মাধ্যমে আবারও হলভিত্তিক দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে কমিটির সমালোচনা করায় অন্তত তিন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এমন গুঞ্জন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি, তবুও এই খবর পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
রাতের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীরা স্পষ্ট করে জানান, তারা নিরাপদ ও নিরপেক্ষ আবাসিক পরিবেশ চান। তাদের কথায়, “হল কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণে যেতে পারে না। এখানে পড়াশোনার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।” কেউ কেউ অভিযোগ করেন, দলীয় প্রভাব বাড়লে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হয় এবং ভীতির সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।
এদিকে, ছাত্রদলের নতুন কমিটি নিয়েও আগে থেকেই ভেতরে ভেতরে দ্বন্দ্ব চলছিল। পদবঞ্চিত একটি অংশ ইতোমধ্যে কমিটিকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করে বিক্ষোভ করেছিল। তবে এবারের ঘটনাপ্রবাহ ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে—দলীয় বিরোধের গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরাই সরাসরি মাঠে নেমেছেন, যাদের বড় অংশই নারী।
কলেজ প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না মিললেও সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে শিক্ষক ও হল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তিতুমীর কলেজে এর আগেও বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন হয়েছে। বিশেষ করে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে কয়েক দফা আন্দোলনে ছাত্রীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নজর কেড়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় আবারও মধ্যরাতে ছাত্রীদের রাস্তায় নামা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
জানা যাচ্ছে, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্র সংসদ নির্বাচন না হওয়া এবং প্রতিনিধিত্বের অভাব ক্যাম্পাস রাজনীতিকে অস্বচ্ছ করে তুলেছে। এতে করে দলীয় প্রভাব বিস্তার এবং অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব আরও বেড়েছে, যার চাপ এসে পড়ছে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর।
রাতের বিক্ষোভ শেষ হলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি শান্ত হয়নি। শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, বহিষ্কারের গুঞ্জন সত্য প্রমাণিত হলে বা হল রাজনীতি বন্ধে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না এলে তারা আরও বড় কর্মসূচি ঘোষণা করবেন।
নারী শিক্ষার্থীদের এই দৃশ্যমান উপস্থিতি তিতুমীর কলেজের চলমান সংকটকে নতুন মাত্রা দিয়েছে—যা ভবিষ্যতে ক্যাম্পাস রাজনীতির গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
