ইরান যুদ্ধ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)-এর সঙ্গে তার সমন্বয় রয়েছে বলে দাবি করেছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু (Benjamin Netanyahu)। তিনি বলেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে তার প্রায় প্রতিদিনই কথা হয় এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সম্পর্কের সবকিছু ঠিকঠাক রয়েছে।
তবে নেতানিয়াহুর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন কয়েক সপ্তাহ ধরেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হচ্ছে যে, ইরান সংঘাতের বিষয়ে ইসরাইলকে আর আগের মতো গুরুত্ব দিয়ে পরামর্শ করছে না ওয়াশিংটন। ইসরাইলের সাধারণ জনগণ এবং স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের একাংশের মধ্যেও নেতানিয়াহুর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। ফলে তার সাম্প্রতিক ভিডিও বার্তার পর নতুন করে জল্পনা শুরু হয়েছে— বাস্তব পরিস্থিতি হয়তো প্রকাশিত তথ্যের চেয়েও জটিল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও জনমত জরিপকারী ডালিয়া শাইন্ডলিন বলেন, নেতানিয়াহু বারবার সম্পর্কের দৃঢ়তার কথা বলছেন, যা উল্টো দুই নেতার সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তার ভাষায়, যুদ্ধের পরিস্থিতি যেভাবে এগোচ্ছে, তাতে উদ্বেগ বাড়ছেই।
ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে একে অপরের প্রতিচ্ছবি হিসেবে দেখা হয়। অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আধিপত্য ধরে রাখতে দুজনই জনতুষ্টিবাদী কৌশল নিয়েছেন বলে বিশ্লেষকদের অভিমত। একই সঙ্গে প্রচলিত রাজনৈতিক রীতি ও সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতাকে উপেক্ষা করার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলার পর থেকে ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান অনেকটাই এক সুতোয় বাঁধা পড়ে গেছে বলে মনে করা হচ্ছে। কয়েক দশক ধরে নেতানিয়াহু একের পর এক মার্কিন প্রশাসনকে ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। ২০১৮ সালে তিনিই ট্রাম্পকে ইরানের সঙ্গে বহুপক্ষীয় পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে প্ররোচিত করেছিলেন বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা রয়েছে। এর ফলেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি আরও জোরদার হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নেতানিয়াহু ট্রাম্পকে বোঝান যে, ইরানের পরমাণু হুমকির একমাত্র কার্যকর সমাধান হলো সামরিক অভিযান এবং সেই যুদ্ধে দ্রুত জয় পাওয়া সম্ভব। এর আগে মার্কিন বাহিনীর অভিযানে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো (Nicolás Maduro)-কে কারাকাস থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাও আলোচনায় আসে।
ইসরাইলের সাবেক কূটনীতিক অ্যালন পিঙ্কাসের দাবি, নেতানিয়াহু ভেনিজুয়েলার ঘটনাকে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করে ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন যে, ইরানের অর্থনীতি ভেঙে পড়ার পথে এবং দেশটির জনগণ বিদ্রোহের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে। তিনি ট্রাম্পকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে, কয়েক দিনের মধ্যেই ইরানের শাসনব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়বে।
কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্কিন গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তারা শুরু থেকেই আশঙ্কা করেছিলেন যে ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে পাল্টা হামলা চালাতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে। তবে নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথসহ প্রশাসনের কড়া অবস্থানপন্থিরা মনে করেছিলেন, ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর পাল্টা জবাব দেওয়ার মতো সক্ষমতা নেই।
শেষ পর্যন্ত সেই হিসাব ভুল প্রমাণিত হয়। ইরানের জনগণের মধ্যে বড় ধরনের বিদ্রোহ দেখা যায়নি, সরকারও ভেঙে পড়েনি। বরং ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা, মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে আঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা তৈরির সক্ষমতা দেখিয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে উঠে এসেছে।
অ্যালন পিঙ্কাসের ভাষ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর প্রায় এক মাস পর থেকেই ট্রাম্প নেতানিয়াহুর ওপর বিরক্ত ও হতাশ হয়ে পড়েন। এর পর থেকেই ট্রাম্পের বক্তব্যে ইসরাইল বা নেতানিয়াহুর নাম উল্লেখ কমে যায়। ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণার আগে যখন মার্কিন আলোচকরা ইরানি প্রতিনিধিদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেন, তখন ইসরাইলকে পুরো প্রক্রিয়া থেকে অনেকটাই দূরে রাখা হয়েছিল বলেও দাবি করা হচ্ছে।
শান্তি আলোচনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনীর মতো ইসরাইলের অগ্রাধিকারের বিষয়গুলো অনুপস্থিত ছিল বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে তেলআবিবের অসন্তোষ আরও বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইলে নিযুক্ত সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যানিয়েল শ্যাপিরো বলেছেন, ট্রাম্প এখন ইরানের বাইরেও বড় ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের দিকে নজর দিচ্ছেন। বিশেষ করে ১৪ মে চীন সফর এবং প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং (Xi Jinping)-এর সঙ্গে বৈঠক তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে নেতানিয়াহুও বুঝতে পারছেন, ট্রাম্প পুরোপুরি ইসরাইল থেকে রাজনৈতিক দূরত্ব তৈরি করতে পারবেন না। কারণ, মার্কিন রাজনীতিতে ইসরাইল প্রশ্ন এখনো বড় প্রভাব রাখে। ট্রাম্পের সাবেক জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের মন্তব্যও সেই ইঙ্গিত দেয়।
অ্যালন পিঙ্কাসের মতে, ট্রাম্প যদি প্রকাশ্যে নেতানিয়াহুর প্রতি হতাশা দেখান, তাহলে সেটি পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া হবে যে, তাকে এই যুদ্ধে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করা হয়েছিল। আর সেই রাজনৈতিক মূল্য দুজনকেই দিতে হতে পারে।
আগামী অক্টোবরের মধ্যে ইসরাইলে নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। বর্তমান জরিপগুলো বলছে, নির্বাচনে নেতানিয়াহুর ক্ষমতা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রেও কংগ্রেস নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের জন্য এই যুদ্ধ রাজনৈতিক চাপ বাড়াতে পারে।
পিঙ্কাসের ভাষায়, এই সংঘাত শুধু ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতাই বদলায়নি, বরং ট্রাম্প ও নেতানিয়াহু— উভয় নেতাকেই রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)


