ইরান-উপসাগরীয় উত্তেজনায় নতুন মোড়, গোপন হামলার অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ

ইরানের বিরুদ্ধে গোপনে সামরিক হামলা চালিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (United Arab Emirates)—এমন তথ্য প্রকাশের পর মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন করে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে আমিরাতসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (Wall Street Journal)-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের হামলার জবাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত গোপনে বড় ধরনের পাল্টা আক্রমণ চালায়। ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার ঠিক আগেই গত ৭ এপ্রিল ইরানের লাজান দ্বীপে হামলা চালানো হয়।

এদিকে কুয়েত (Kuwait) জানিয়েছে, দেশটির উপকূলীয় বৃহত্তম দ্বীপ বুবিয়ান দ্বীপে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করার সময় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (IRGC) অন্তত চার সদস্যকে আটক করা হয়েছে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানা যায়, তারা মাছ ধরার নৌকায় করে দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করেছিল। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেনি ইরান (Iran)।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) সাম্প্রতিক বক্তব্যে বলেছেন, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের শর্ত অনুযায়ী ছাড় না দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধবিরতি এখন “সূতার ওপর ঝুলছে”। এতে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন (Pentagon) জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের ব্যয় বেড়ে প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দুই সপ্তাহ আগের তুলনায় প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার বেশি।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া সংঘাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অন্যতম লক্ষ্য ছিল সংযুক্ত আরব আমিরাত। পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণসহ বিভিন্ন কারণে তেহরানের সঙ্গে আমিরাতের কূটনৈতিক বৈরিতা দীর্ঘদিনের। এবার সেই বৈরিতা সরাসরি সামরিক পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সংযুক্ত আরব আমিরাত পরিচালিত ফরাসি মিরাজ যুদ্ধবিমান এবং চীনা উইং লং ড্রোন ইরানের আকাশসীমায় সক্রিয় ছিল বলে স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে। এর আগে ইরান অভিযোগ করেছিল, আমিরাত ও কুয়েত তাদের বিরুদ্ধে হামলায় সহযোগিতা করেছে।

তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে এ বিষয়ে এখনো ঐক্যবদ্ধ অবস্থান দেখা যাচ্ছে না। সৌদি আরব (Saudi Arabia) ও কাতার (Qatar) এখনো সরাসরি সামরিক প্রতিশোধে জড়াতে অনাগ্রহী। সৌদি আরবের সাবেক রাষ্ট্রদূত তুর্কি আল-ফয়সাল সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে গোটা অঞ্চল ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, সৌদি আরব যুদ্ধে জড়ালে দেশের পূর্বাঞ্চলের তেল স্থাপনা, লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র এবং হজ ব্যবস্থাপনা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়বে। একই সঙ্গে থমকে যেতে পারে দেশের উচ্চাভিলাষী ভিশন ২০৩০ প্রকল্প।

ইসরাইলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি জানিয়েছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রতিরক্ষা জোরদারে দেশটিতে আয়রন ডোম ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও সেনা সদস্য পাঠিয়েছে ইসরাইল (Israel)।

এদিকে সাম্প্রতিক ইরানি হামলায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সবচেয়ে বড় গ্যাস প্ল্যান্ট প্রায় দুই বছরের জন্য বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠান অ্যাডনক গ্যাস (Adnoc Gas)। প্রতিষ্ঠানটির ভাষ্য অনুযায়ী, আগামী বছর পর্যন্ত পুরোপুরি মেরামত সম্ভব হবে না। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ উৎপাদন সক্ষমতা ৮০ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে, আর পূর্ণ সক্ষমতায় ফিরতে সময় লাগতে পারে ২০২৭ সাল পর্যন্ত।

প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান (The Guardian)।