লাইসেন্সবিহীন একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তরের (বিপিও) ১০ বছরের গোপন চুক্তির তথ্য সামনে আসায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ব্যবহার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং ব্যক্তি স্বার্থে সরকারি সুবিধা বণ্টন নিয়ে। অভিযোগ উঠেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার (Mostafa Jabbar)-এর প্রত্যক্ষ প্রভাবেই একপেশে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়।
প্রতিষ্ঠানটির মূল নাম ছিল ইপোস্ট সফটওয়্যার লিমিটেড (Epost Software Limited)। পরে নাম পরিবর্তন করে করা হয় ক্লিকএক্স লিমিটেড। চুক্তির আওতায় ডাক বিভাগের যানবাহন, অবকাঠামো ও জনবল ব্যবহার করে ই-কমার্স পার্সেল পরিবহন করছে প্রতিষ্ঠানটি। অথচ পরিবহনের প্রায় পুরো দায়ভার ও খরচ বহন করছে বিপিও, আর আয়ের বড় অংশ যাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের খাতায়।
২০২২ সালে ই-ক্যাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল ওয়াহেদ তমাল, তার স্ত্রী নুসরাত আখতার এবং সাবেক পরিচালক আশীষ চক্রবর্তী মিলে গড়ে তোলেন ইপোস্ট সফটওয়্যার লিমিটেড। আরজেএসসিতে জমা দেওয়া নথি অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন যথাক্রমে তমাল ও নুসরাত। পরে পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন খন্দকার তাসফিন আলম এবং পেপারফ্লাইয়ের সাবেক প্রধান নির্বাহী শাহরিয়ার হাসান।
জুলাই অভ্যুত্থানের আগে তমাল নিজেকে তৎকালীন মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বারের ‘ভাতিজা’ পরিচয়ে পরিচিত করতেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
লাইসেন্স ছাড়া কুরিয়ার কার্যক্রম
বিধিমালা অনুযায়ী, পার্সেল সংগ্রহ ও সরবরাহের জন্য কুরিয়ার লাইসেন্স বাধ্যতামূলক। কিন্তু লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত হালনাগাদ তালিকায় ইপোস্ট বা ক্লিকএক্সের নাম পাওয়া যায়নি।
অনুসন্ধানে পাওয়া নথি অনুযায়ী, ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ বিবেচনায় ইপোস্টকে লাইসেন্স দিতে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেন মোস্তাফা জব্বার। কিন্তু বিধিমালা অনুযায়ী “পোস্ট” শব্দ ব্যবহার করায় শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিকে লাইসেন্স দেওয়া সম্ভব হয়নি।
লাইসেন্স না পেলেও থেমে থাকেনি প্রতিষ্ঠানটি। ২০২২ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি বিপিওর সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক এবং একই বছরের ৭ নভেম্বর মূল চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে বিপিওর পক্ষে সই করেন তৎকালীন পরিচালক (ডাক) এস এম হারুনুর রশীদ এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষে আব্দুল ওয়াহেদ তমাল।
চুক্তির শর্ত ঘিরে প্রশ্ন
চুক্তিটি ছিল ‘গোপনীয়’ এবং এর মেয়াদ নির্ধারণ করা হয় ১০ বছর। চুক্তি বাতিল করতে হলে অন্তত এক বছর আগে কারণ উল্লেখ করে নোটিশ দিতে হবে। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটির বিনিয়োগ করা অর্থও বিপিওকে সমন্বয় করে দিতে হবে।
সাবেক সচিব ও জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ একেএম আবদুল আউয়াল মজুমদার (AKM Abdul Auwal Majumdar) এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি গোপন রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। তার ভাষায়, “গোপন চুক্তি মানেই এখানে দুষ্টামির সুযোগ রয়েছে।”
সব দায় ডাক বিভাগের, লাভ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের
চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দেশের প্রতিটি ডাকঘরে ইপোস্টের বুথ স্থাপন, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, আসবাব, নিরাপত্তা ও জনবলের ব্যবস্থা করবে বিপিও। পার্সেল সংরক্ষণ, যাচাই-বাছাই এবং ডেলিভারির প্রস্তুতির পুরো দায়িত্বও ডাক বিভাগের।
এমনকি পরিবহনের সময় পণ্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতিপূরণও দিতে হবে বিপিওকে। অথচ ঢাকার ভেতরে প্রতি পার্সেলে ৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৮০ টাকা নেওয়া হলেও বিপিও পায় যথাক্রমে মাত্র ১০ ও ২০ টাকা।
ডাক বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিপিওর নিজস্ব সফটওয়্যার বাদ দিয়ে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে ইপোস্টের সিস্টেমে। এতে তথ্য বা হিসাব হেরফেরের ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “সব বিনিয়োগ ও দায় ডাক বিভাগের, আর মুনাফা ইপোস্টের। বিপিও চাইলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেই এই কাজ করতে পারত।”
ডাকমাশুল আটকে রাখার সুযোগ
চুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত অনুযায়ী, বিপিও প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে বিল পাঠাবে এবং ইপোস্ট ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সেই অর্থ পরিশোধ করবে। অর্থাৎ প্রায় ৭০ দিন পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় সংস্থার প্রাপ্য অর্থ নিজেদের কাছে রাখতে পারছে প্রতিষ্ঠানটি।
যেখানে পোস্ট অফিস অ্যাক্ট অনুযায়ী ডাকমাশুল বাকি রেখে পার্সেল বিতরণের সুযোগ নেই, সেখানে এই বিশেষ সুবিধা কীভাবে দেওয়া হলো— তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
মন্ত্রণালয়ের আপত্তিও উপেক্ষিত
“পোস্ট” শব্দ ব্যবহারের কারণে লাইসেন্স আটকে গেলেও পরবর্তীতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ একই কারণে চুক্তিতেও আপত্তি জানায়। পরে “ফাস্টডোর লজিস্টিক লিমিটেড” নামে নতুন চুক্তির প্রস্তাব আসে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই চুক্তিও হয়নি।
ডাক বিভাগের একাধিক সভায় কর্মকর্তারা চুক্তির বৈধতা, প্রশাসনিক অনুমোদন এবং রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কার বিষয়টি তুলেছিলেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে উপসচিব রফিকুল ইসলাম চার কার্যদিবসের মধ্যে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠিও পাঠান। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোনো প্রতিবেদন জমা হয়নি।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রতিষ্ঠানটির মালিকানাতেও পরিবর্তন আসে। বর্তমানে ক্লিকএক্স লিমিটেড নামে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির মালিকানা নেন তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ব্যবসায়ী রাফেল কবির।
ইপোস্টের প্রতিষ্ঠাতা আব্দুল ওয়াহেদ তমাল অবশ্য সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, ডিজিটাল কমার্সকে জনপ্রিয় করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং এতে ডাক বিভাগের লাভ হওয়ার কথা ছিল।
বর্তমান ক্লিকএক্স কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগের ব্যবস্থাপনার কোনো সিদ্ধান্তের দায় তারা নেবে না। তবে সব কার্যক্রম নতুন করে মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তর (Bangladesh Post Office)-এর মহাপরিচালক কাজী আসাদুল ইসলাম জানিয়েছেন, চুক্তিটি আগের প্রশাসনের সময়ে হয়েছে এবং বিষয়টি পর্যালোচনা করা হবে। কোনো অসংগতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।
