বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ চলচ্চিত্র আয়োজন কান চলচ্চিত্র উৎসব (Cannes Film Festival)-এর লাল গালিচা বরাবরই আভিজাত্য, ফ্যাশন আর তারকাখচিত উপস্থিতির জন্য আলোচনায় থাকে। তবে ২০২৬ সালের আসরে গ্ল্যামারের কেন্দ্রে উঠে এসেছেন একদল প্রবীণ নারী তারকা, যাদের উপস্থিতি শুধু ফ্যাশনের নয়, বরং বয়স নিয়ে দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণাকেও নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
৯২ বছর বয়সী জোন কলিন্স (Joan Collins) লাল গালিচায় হাজির হন স্টেফান রোল্যান্ডের নকশা করা সাদা স্ট্র্যাপলেস গাউনে। অন্যদিকে ৮৮ বছর বয়সী জেন ফন্ডা (Jane Fonda) পরেছিলেন গুচির তৈরি মেঝে ছোঁয়া সিকুইন ড্রেস। ৭৩ বছর বয়সী ইসাবেলা রোসেলিনি (Isabella Rossellini)-কে দেখা গেছে দৃষ্টিনন্দন টু-পিস পোশাকে, আর ৮২ বছর বয়সী ক্যাথরিন ডেন্যুভ গাঢ় সবুজ সাটিনের পোশাক ও হুপ ইয়াররিংয়ে হাজির হয়ে নজর কাড়েন।
এই প্রবীণ তারকারা কেবল ফ্যাশনের প্রদর্শনীতে অংশ নিতেই আসেননি। নিজেদের নতুন চলচ্চিত্র ও প্রজেক্টের প্রচারণার অংশ হিসেবেই তাদের উপস্থিতি ছিল। জোন কলিন্স এবং ইসাবেলা রোসেলিনি অভিনয় করেছেন ওয়ালিস সিম্পসনের বায়োপিক ‘মাই ডাচেস’-এ। অন্যদিকে জেন ফন্ডা অংশ নেন লরিয়েলের একটি আয়োজনে। লাল গালিচায় তাদের দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী উপস্থিতি বয়স বৈচিত্র্যের শক্তিশালী বার্তাও বহন করেছে।
বয়স নিয়ে প্রচলিত সামাজিক ধারণার বাইরে গিয়ে স্টাইল ও ব্যক্তিত্ব নিয়ে কাজ করা ‘দ্যাটস নট মাই এজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা অ্যালিসন ওয়ালশ (Alison Walsh) বলেন, “লাল গালিচায় এই বয়সী নারীদের দেখা সত্যিই অসাধারণ। জোন কলিন্সকে আমার মায়ের বয়সী হয়েও এতটা সুপার-গ্ল্যামারাস দেখাচ্ছে, যা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
ফ্যাশন জগতে এই পরিবর্তনের ইঙ্গিত অবশ্য নতুন নয়। ৬০ বছর বয়সী অভিনেত্রী ডেমি মুর এবার কানে জ্যাকমুস এবং গুচির পোশাকে হাজির হয়েছেন। ‘এমিলি ইন প্যারিস’ খ্যাত ৬৩ বছর বয়সী অভিনেত্রী ফিলিপিন লেরয়-বিউলিউ সম্প্রতি সেন্ট লরেন্টের তৈরি একটি পার্পল ড্রেস পরে আলোচনায় আসেন, যে পোশাকটি এর আগে পপ তারকা বিয়ন্সেও পরেছিলেন।
রোহ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক এবং ‘ফিমেল সেলিব্রিটি অ্যান্ড এজেইং: ব্যাক ইন দ্য স্পটলাইট’-এর সম্পাদক ডেবোরা জার্মিন (Deborah Jermyn) মনে করেন, লাল গালিচার মূল উদ্দেশ্যই হলো সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করা, অথচ এই বয়সী নারীদের খুব কমই এমন প্ল্যাটফর্মে দেখা যায়। ফলে তাদের এই উপস্থিতি নিজেই একটি সামাজিক বার্তা হয়ে উঠছে।
তরুণদের আধিপত্যে অভ্যস্ত ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতেও এখন প্রবীণ নারীদের উপস্থিতি দৃশ্যমানভাবে বাড়ছে। চ্যানেল, ব্যালেন্সিয়াগা, লুই ভিটন এবং গিভেঞ্চির সাম্প্রতিক শোগুলোতে ৪০ বছরের বেশি বয়সী মডেলদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখা গেছে। ৭৯ বছর বয়সী শিল্পী মিং স্মিথ অংশ নিয়েছেন ক্যারোলিনা হেরেরার শো-তে, আর ৭৮ বছর বয়সী লেখিকা জোন জুলিয়েট বাক অংশ নেন সেলিনের শো-তে। ২০২৩ সালে ৮৮ বছর বয়সে প্রয়াত অভিনেত্রী ম্যাগি স্মিথ লোয়েভের ক্যাম্পেইনে অংশ নিয়ে আলোচনায় এসেছিলেন।
২০১৩ সাল থেকে প্রবীণ মডেলদের নিয়ে কাজ করা ‘মিসেস রবিনসন’ মডেলিং এজেন্সির সহ-প্রতিষ্ঠাতা রেবি মেরিলিওন জানিয়েছেন, বর্তমানে ৪৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী মডেলদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এমনকি ৬০ ও ৭০ বছর বয়সীরাও এখন নিয়মিত ফ্যাশন শুটে অংশ নিচ্ছেন।
তার ভাষায়, “গ্রাহকেরা এখন বুঝতে পারছেন যে প্রবীণ নারীদের সমাজে যথেষ্ট প্রভাব এবং ক্রয়ক্ষমতা রয়েছে।”
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে প্রবীণ জনগোষ্ঠী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক প্রভাবও বাড়ছে। ‘গ্রে পাউন্ড’ নামে পরিচিত এই অর্থনৈতিক শক্তি এখন ফ্যাশন ও বিনোদন শিল্পের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের হাউজ অব কমন্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০৭২ সালের মধ্যে যুক্তরাজ্যের মোট জনসংখ্যার ২৭ শতাংশের বয়স হবে ৬৫ বছরের বেশি। ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৯ শতাংশ।
তবে পুরো পরিবর্তনটিকে সবাই নিখুঁত অগ্রগতি হিসেবেও দেখছেন না। অ্যালিসন ওয়ালশের মতে, এখানে এখনো এক ধরনের স্ববিরোধিতা রয়ে গেছে। সমাজ যেন বয়স বাড়াকে মেনে নেয়, কিন্তু শর্ত হলো—দেখতে যেন বয়স্ক না লাগে।
সমালোচকদের আরেকটি পর্যবেক্ষণও গুরুত্বপূর্ণ। কানের লাল গালিচায় আলোচনায় আসা এই প্রবীণ নারীদের প্রায় সবাই শ্বেতাঙ্গ, শারীরিকভাবে ফিট এবং প্রচলিত সৌন্দর্যের মানদণ্ডে মানানসই। ফলে পশ্চিমা সংস্কৃতিতে বর্ণ ও শারীরিক বৈচিত্র্যের সীমাবদ্ধতাও এখানেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তবে ডেবোরা জার্মিন মনে করেন, ভবিষ্যতে এই জায়গায় পরিবর্তন আসতে পারে। ভায়োলা ডেভিস কিংবা অ্যাঞ্জেলা বাসেটের মতো কৃষ্ণাঙ্গ অভিনেত্রীরা যেভাবে দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছেন, তাতে আগামী দশকে তারাও এই গ্ল্যামারাস প্ল্যাটফর্মে আরও শক্ত অবস্থানে থাকবেন।
তার মতে, একটি নির্দিষ্ট বয়সের পর নারীদের জনসমুখ থেকে আড়ালে সরে যাওয়ার যে দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস রয়েছে, কানের লাল গালিচা এখন ধীরে ধীরে সেই ধারণাকেই বদলে দিচ্ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান


