দেশের প্রতিটি উপজেলায় এআই ট্রেনিং সেন্টার স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন ফকির মাহবুব আনাম (Fakir Mahbub Anam)। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী বলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বিস্তৃত করতে সরকার অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। উপজেলা পর্যায়ে সেন্টার গড়ে তুলে তরুণদের এআই, ডিজিটাল দক্ষতা ও ফ্রিল্যান্সিং শেখানো হবে। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করেছে এবং আসন্ন বাজেটে একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা প্রণয়ন করা হবে।
শনিবার সকালে রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে টিআরএনবি (TRNB) আয়োজিত ‘টেলিযোগাযোগ খাতের ভবিষ্যৎ: কী ভাবছে সরকার’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বর্তমান সরকার দেশের টেলিকম খাতকে আধুনিক, বিনিয়োগবান্ধব এবং ভবিষ্যৎ উপযোগী খাতে রূপ দিতে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে। ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও দ্রুতগতির ইন্টারনেট ও প্রযুক্তিসেবা পৌঁছে দেওয়া এখন সরকারের অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন স্থাপন, টেলিকম অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান তৈরির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, টেলিকম খাতে নীতিগত স্থিতিশীলতা, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে। ৫জি, এআই, আইওটি ও ক্লাউডভিত্তিক সেবার বিস্তারে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব আরও শক্তিশালী করা হবে। পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর আধুনিকায়নের মাধ্যমে সেবার মান বৃদ্ধি ও গ্রাহকবান্ধব পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে ডিজিটাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট, উদ্ভাবন এবং স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। গ্রামীণ এলাকায় নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট সংযোগ ও ডিজিটাল সেবার বিস্তার নিশ্চিত করতে দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামোগত পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
দেশের টেলিকম খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, সরকার ৫-জি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে গ্রামীণ পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে দিতে কাজ করছে। এই খাতে দু’\র্নীতি নিয়ন্ত্রণেও সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। আগামী পাঁচ বছরে আইসিটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হবে বলেও জানান তিনি।
রাষ্ট্রীয় মোবাইল অপারেটর টেলিটক (Teletalk)-এর প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, আগামীতে ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা গেলে টেলিটক গ্রামীণফোনকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ (Rehan Asif Asad) বলেন, এবারের বাজেটে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব না হলেও আইসিটি খাতের জন্য বড় সুখবর থাকবে। ভবিষ্যতে দেশের জিডিপিতে আইসিটি খাতের অবদান ১০ থেকে ১৫ শতাংশে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিনিয়োগবান্ধব নীতি, স্থিতিশীল করব্যবস্থা ও প্রযুক্তিনির্ভর অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে। একইসঙ্গে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে স্মার্টফোন পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সরকারের লক্ষ্য শুধু স্পেকট্রাম থেকে রাজস্ব আয় নয়, বরং শক্তিশালী ডিজিটাল ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রবির হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম। তিনি জানান, ২০১৫ সালের তুলনায় ২০২৫-২৬ নাগাদ দেশে মোবাইল গ্রাহক সংখ্যা ৩৯ শতাংশ বেড়ে ১৮ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছেছে। একই সময়ে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৩৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে মোট জনসংখ্যার ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহার ৮৬ জিবিপিএস থেকে ১২৭ গুণ বেড়ে প্রায় ১০ হাজার ৯৫৪ জিবিপিএসে উন্নীত হয়েছে। গ্রাহকপ্রতি মোবাইল ডাটা ব্যবহারের পরিমাণও ১০০ এমবি থেকে বেড়ে ৮ জিবিতে পৌঁছেছে।
তবে এত অগ্রগতির পরও বাংলাদেশ এখনো মূলত প্রযুক্তি ব্যবহারের বাজার হিসেবেই রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেন সাহেদ আলম। তার ভাষায়, আন্তর্জাতিক বাজারের মতো উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি উদ্ভাবন বা সেবা রপ্তানি কেন্দ্র হিসেবে দেশ এখনো পুরোপুরি আত্মপ্রকাশ করতে পারেনি।
টিআরএনবির সভাপতি সমীর কুমার দে’র সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। এসময় আরও বক্তব্য রাখেন বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী, টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ চৌধুরী, এমটবির মহাসচিব লে. কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার, ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নুরুল কবীর, বাংলাদেশ কম্পিটিশন কমিশনের সাবেক পরিচালক খালেদ আবু নাসের, বাংলালিংকের হেড অব রেগুলেটরি অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স তাইমুর রহমান এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)-এর টেলিকম বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. লুৎফা আক্তার।
