কোরবানির পশুর বাজার জমতে শুরু, ভারতীয় গরু না এলে লাভের আশা ঈশ্বরদীর খামারিদের

আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ঈশ্বরদী (Ishwardi) উপজেলার কোরবানির পশুর বাজারে এখন থেকেই প্রাণচাঞ্চল্য দেখা যাচ্ছে। ভোগান্তি এড়াতে অনেকে আগেভাগেই ভাগে কিংবা এককভাবে কোরবানির পশু কিনতে শুরু করেছেন। কেউ হাট থেকে, কেউ খামার ঘুরে আবার কেউ সরাসরি গৃহস্থের বাড়ি থেকে নিজেদের পছন্দের গরু ও ছাগল কিনছেন। সারাবছর যত্নে লালন-পালন করা পশু বিক্রির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন খামারি ও গৃহস্থরা। পাশাপাশি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও গরু বিক্রি করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন অনেকে।

খামারিদের আশা, এবার কোরবানির আগে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ না করলে দেশীয় খামারিরা ভালো লাভের মুখ দেখবেন। তাদের ভাষ্য, সারাবছরের পরিশ্রমের পর বর্তমান বাজারদর মোটামুটি সন্তোষজনক। তবে ঈদের আগে সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় গরু ঢুকে পড়লে লোকসানের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

একসময় যেখানে গবাদিপশুর খামার খুব একটা চোখে পড়ত না, এখন সেখানে গ্রামগঞ্জজুড়ে গড়ে উঠেছে অসংখ্য ছোট-বড় খামার। পাবনা (Pabna) জেলার ঈশ্বরদী উপজেলায় গবাদিপশুর খামার এখন অনেকের জীবিকা ও স্বপ্নের জায়গা হয়ে উঠেছে। শিক্ষিত তরুণরাও ঝুঁকছেন এই খাতে। ২০১৪ সালে ভারত থেকে গরু আমদানি বন্ধ হওয়ার পর থেকেই এখানে বাণিজ্যিক খামারের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

শনিবার (১৬ মে) সরেজমিনে বিভিন্ন পশুহাট ও খামার ঘুরে দেখা যায়, ঈদুল আজহা ঘিরে কোরবানির পশুর বাজার ইতোমধ্যেই জমে উঠেছে। খামারি, গৃহস্থ, ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের আনাগোনায় ব্যস্ত সময় কাটছে পশুহাটগুলোতে। উপজেলার ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩ হাজার ৫৫ জন খামারি এবারের কোরবানির জন্য প্রায় ৭৪ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত করেছেন। অথচ স্থানীয় চাহিদা রয়েছে প্রায় ৪৩ হাজার পশুর। ফলে এখানকার উদ্বৃত্ত পশু রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে।

বিশেষ করে অরণকোলা এলাকার পশুহাটকে ঘিরে গড়ে উঠেছে শতাধিক গবাদিপশুর খামার। এসব খামারে শাহিওয়াল, দেশাল, ঘির, হরিয়ানা, ফ্রিজিয়ান, জার্সি ও ব্রাহামা ক্রসসহ বিভিন্ন জাতের গরু লালন-পালন করা হচ্ছে। ৩ থেকে ১২ মণ ওজনের গরুই বেশি দেখা যাচ্ছে এসব খামারে। বর্তমানে ৩ থেকে সাড়ে ৩ মণ ওজনের গরু বিক্রি হচ্ছে ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকায়। ৫ মণের গরুর দাম উঠছে প্রায় দেড় লাখ টাকা, আর ৮ থেকে ১০ মণ ওজনের বড় গরুর দাম ৪ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত।

তানভীর ডেইরি খামার (Tanvir Dairy Farm)–এর স্বত্বাধিকারী গোলাম কিবরিয়া সোহান জানান, তাদের খামারে প্রতিবছর ১৫০ থেকে ২০০ গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়। ইতোমধ্যে অনেক গরু বিক্রি হয়ে গেছে। দুই বছর ধরে লালন-পালন করা ১৪০০ কেজি ওজনের একটি গরুও সম্প্রতি বিক্রি হয়েছে। তিনি বলেন, গরুর খাদ্য, শ্রমিকের বেতন ও চিকিৎসা খরচ বাড়ায় আগের মতো লাভ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারপরও ভারতীয় গরু না এলে দেশীয় খামারিরা কিছুটা হলেও লাভবান হবেন।

মুনতাহা ডেইরি ফার্ম (Muntaha Dairy Farm)–এর স্বত্বাধিকারী বাচ্চু প্রামানিক বলেন, অনলাইন ও সরাসরি—দুইভাবেই গরু বিক্রি হচ্ছে। তিনি ক্রেতাদের পরামর্শ দিয়ে বলেন, সাইনবোর্ড ও পরিচিত খামার দেখে গরু কেনা নিরাপদ। তবে সরাসরি খামারে এসে গরু দেখে কেনাই সবচেয়ে ভালো।

অন্যদিকে তোহা ডেইরি ফার্ম (Toha Dairy Farm)–এর স্বত্বাধিকারী আমিনুল হক বলেন, বর্তমানে অনেকেই হাটের ভিড় ও ঝামেলা এড়িয়ে সরাসরি খামার থেকেই গরু কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি জানান, ভারতীয় গরু বাজারে প্রবেশ করলে দাম পড়ে যেতে পারে। তাই সীমান্তে কঠোর নজরদারির দাবি জানান তিনি।

খামারিরা জানান, ৩ থেকে সাড়ে ৩ মণ ওজনের একটি গরু সারাবছর লালন-পালনে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। প্রতিদিন খেসারি, ধান, ভুট্টা, ভুসি ও কাঁচা ঘাসসহ বিপুল পরিমাণ খাবার সরবরাহ করতে হয়। এছাড়া রয়েছে শ্রমিকের বেতন, বিদ্যুৎ বিল ও চিকিৎসা খরচ। ফলে লাভের পরিমাণ আগের তুলনায় কমে এসেছে।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোছা. আকলিমা খাতুন বলেন, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে পশুহাটে জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে দুইটি ভেটেরিনারি মেডিকেল টিম গঠন করা হয়েছে। তিনি জানান, প্রাণিসম্পদ খাত এখন গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে। খামারিদের প্রশিক্ষণ, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে তাদের আরও উৎসাহিত করার চেষ্টা চলছে।