জুলাই গণঅ’ভ্যুত্থানের পর দেশজুড়ে প্রশাসনিক পরিবর্তনের হাওয়া বইলেও বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (Bangladesh Water Development Board) বা বাপাউবোতে এখনো বহাল রয়েছে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ শক্তিশালী একটি সিন্ডিকেট— এমন অভিযোগ তুলেছেন ফ্যাসিবাদবিরোধী কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, ফ্যাসিবাদী সরকারের দোসর, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদ ও বাপাউবো বঙ্গবন্ধু পরিষদের প্রভাবশালী নেতারাই এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল থেকে পুরো প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সাবেক পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ার (Kabir Bin Anwar)-এর ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারাই এখনো বাপাউবোর মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গাগুলো দখলে রেখেছেন। বদলি-পদায়ন থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তেও এখনো তার প্রভাব কার্যকর রয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
ফ্যাসিবাদবিরোধী কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ে পাঠানো একটি নথিতে বাপাউবোর বর্তমান মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. এনায়েত উল্লাহসহ মোট ৪০ জন কর্মকর্তার নাম উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে অভিযোগ আনা হয়েছে— এদের কেউ আওয়ামী ফ্যাসিস্ট, কেউ সাবেক ছাত্রলীগ নেতা, কেউ আবার ফ্যাসিবাদী সরকারের আশ্রয়দাতা। কয়েকজনের বিরুদ্ধে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও উল্লেখ করা হয়েছে।
নথির সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে ৬১ সদস্যবিশিষ্ট বাপাউবো বঙ্গবন্ধু পরিষদের সর্বশেষ অনুমোদিত কমিটি। অভিযোগকারীদের দাবি, ওই কমিটির অধিকাংশ সদস্য এখনো প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন এবং পলাতক কবির বিন আনোয়ারের অনুসারী হিসেবেই কাজ করছেন।
এসব অভিযোগ প্রকাশ্যে তোলায় সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মাহবুবে মওলা মো. মেহেদী হাসানকে ড্যাম অ্যান্ড ব্যারাজ দপ্তর থেকে বদলি করে টাঙ্গাইলে পাঠানো হয়। পরে সমালোচনার মুখে ১৫ দিনের মাথায় আবার তাকে ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হয়। তিনি জুলাই গণঅ’ভ্যুত্থানের সময় আন্দোলনকারী কর্মকর্তাদের অন্যতম ছিলেন।
অন্যদিকে, আওয়ামী আমলে সাবেক সচিব কবির বিন আনোয়ারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলামকে টাঙ্গাইল থেকে বদলি করে ঢাকা সার্কেল-১ এ আনা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এখনো কবির বিন আনোয়ারের প্রশংসাসূচক পোস্ট রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নথিতে অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ড. রবিন কুমার বিশ্বাসকে আওয়ামী ফ্যাসিস্ট, সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার এবং ইসকনের সদস্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও তোলা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে ড. রবিন বলেন, তিনি কখনো ছাত্রলীগ করেননি এবং ইসকনের সদস্যও নন। ‘র’-এর সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগকে তিনি “অযৌক্তিক” বলে দাবি করেন।
একইভাবে বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের যুগ্ম সম্পাদক প্রকৌশলী দেওয়ান আইনুল হক (শাম্মা), তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী টি এম রাশেদুল কবির, প্রকৌশলী প্রবীর কুমার গোস্বামীসহ একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আওয়ামী প্রভাব খাটানো, ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে।
টি এম রাশেদুল কবিরের বিরুদ্ধে যমুনা প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এনে তদন্ত কমিটি শাস্তির সুপারিশ করলেও তা ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও তিনি এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নথিতে আরও বলা হয়েছে, বাপাউবোর বর্তমান মহাপরিচালক প্রকৌশলী এনায়েত উল্লাহ বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন সভা-সেমিনারে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদেরই ফোকাল পয়েন্ট হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন। এতে অভিযোগ ওঠে, তিনি আওয়ামী ঘনিষ্ঠদের শেল্টার দিচ্ছেন। তবে এ বিষয়ে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ক্ষোভের পোস্টে প্রকৌশলী মেহেদী হাসান লিখেছেন, ফ্যাসিবাদের দোসরদের “যোগ্য ও স্মার্ট” আখ্যা দিয়ে প্রশাসনে বহাল রাখার যুক্তি দেওয়া হচ্ছে। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, যদি তারাই এত যোগ্য হন, তাহলে “খু’\নি হাসিনা”কেও ফিরিয়ে আনার কথা ভাবা যেতে পারে।
এদিকে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড সিবিএ (BWDB CBA)-এর সভাপতি মঞ্জুরুল ইসলাম মঞ্জু দাবি করেছেন, সরকার ধীরে ধীরে আওয়ামী ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, “একদিনে সব পরিবর্তন সম্ভব নয়। ইতোমধ্যে কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সামনে আরও হবে।”
বাপাউবোর প্রধান প্রকৌশলী (পিআরএল) একেএম শরিফুল ইসলামও স্বীকার করেছেন, এখনো আওয়ামী ও বঙ্গবন্ধু পরিষদের অনেক নেতা গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। তবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
পুরো ঘটনাকে কেন্দ্র করে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভেতরে চাপা ক্ষোভ ও অস্থিরতা বাড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তাদের আশঙ্কা, প্রশাসনের ভেতরে থাকা এই বিভক্তি ও প্রভাবের রাজনীতি চলতে থাকলে প্রতিষ্ঠানটির স্বাভাবিক কার্যক্রম আরও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
