অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিদের নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করার কোনো প্রয়োজন নেই বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান (Md. Asaduzzaman)। তিনি বলেন, একজন প্রধান বিচারপতি অবসরে যাওয়ার পর থেকেই দিন গুনতে থাকেন কবে তিনি ওই রাজনৈতিক পদে যাবেন। অতীতে সাবেক প্রধান বিচারপতিদের রাষ্ট্রের বিভিন্ন লাভজনক বা রাজনৈতিক জায়গায় বসানোর এক ধরনের কুৎসিত চেষ্টা দেখা গেছে এবং বর্তমান সরকার এই নেতিবাচক সংস্কৃতি থেকে স্থায়ীভাবে বেরিয়ে আসতে চায়।
রোববার (১৭ মে) রাজধানীর সিরডাপ (CIRDAP) মিলনায়তনে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এবং গুম সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের অংশীজন সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ এই বিশেষ সভার আয়োজন করে। সভায় সভাপতিত্বও করেন আইনমন্ত্রী নিজেই।
দেশে রাজনৈতিক কর্মীরাই অতীতে সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়েছেন উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বিগত শাসন আমলের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, আগের সরকারের সময়ে রাতে মোমবাতি জ্বালিয়ে আদালত বসিয়ে বিচারের নামে বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের তড়িঘড়ি করে সাজা দেওয়া হয়েছে। অথচ সেই অন্যায়ের রূপকাররা আজও জবাবদিহির বাইরে রয়ে গেছেন। তার ভাষায়, “আমরা অনেক সময় তাদের ফেরেশতার মতো দেখি, তারা এখনও ধরাছোঁয়ার বাইরে।”
তিনি আরও বলেন, এমন ঘটনাও দেশ দেখেছে যেখানে সুপ্রিম কোর্টে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদদের বিচারকের আসনে বসানো হয়েছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অবক্ষয়ের প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, নতুন প্রজন্ম অনেক বেশি মেধাবী এবং দেশের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোকে বাঁচাতে হলে যোগ্য মানুষকে সঠিক জায়গায় বসাতে হবে। কারণ অতীতে ধারাবাহিকভাবে একের পর এক প্রতিষ্ঠানকে পদ্ধতিগতভাবে নষ্ট করা হয়েছে।
গু’\ম সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়নের অগ্রগতি তুলে ধরে তিনি জানান, প্রস্তাবিত আইনের সঙ্গে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (International Crimes Tribunal) আইন এবং মানবাধিকার কমিশন আইনের কোনো সাংঘর্ষিক অবস্থা যেন তৈরি না হয়, সে কারণে খসড়াটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। তিনি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কার খসড়ার সমালোচনা করে বলেন, তখন যেভাবে গু’\ম কমিশন অধ্যাদেশ তৈরি করা হয়েছিল, তা ছিল অপরিপক্ক; ফলে অপরাধীরাই বেশি সুবিধা পেত। বর্তমান সরকার সেটিকে আরও নিখুঁত ও সময়োপযোগী করার চেষ্টা করছে।
আইনমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের মধ্যেই ইতোমধ্যে গু’\মের আন্তর্জাতিক সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যেখানে এ ধরনের অপরাধের তদন্ত ও কঠোর বিচার সম্ভব হবে। সরকার এমন একটি কার্যকর আইন করতে চায় যাতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন নখদন্তহীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত না হয় এবং গু’\মের শিকার পরিবারগুলো প্রকৃত ন্যায়বিচার পায়।
অংশীজন সভায় অন্যতম আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গু’\ম হওয়া বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী (Ilias Ali)-র স্ত্রী এবং বর্তমান সংসদ সদস্য তাহসীনা রুশদীর লুনা। আবেগঘন বক্তব্যে তিনি বলেন, “২০১২ সালে রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ মদদে আমার স্বামীকে গু’\ম করা হয়েছিল। এরপর আরও অসংখ্য মানুষ গু’\মের শিকার হয়েছেন। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও নিখোঁজদের বিষয়ে নতুন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য আমরা পাইনি।”
তিনি দেশ থেকে গু’\ম কালচার চিরতরে নিষিদ্ধ করার দাবি জানান এবং নিখোঁজদের সন্ধানে সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য সরবরাহের আহ্বান জানান।
এই নীতিনির্ধারণী সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court)-এর অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল, সংসদ সদস্য সানজিদা ইসলাম তুলি, ইউএনডিপি বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, জেলা ও দায়রা জজ শামসুদ্দিন মাসুম এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও খালেদ হামিদ চৌধুরী প্রমুখ।
