জু’\লাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, ২০২৬ সালের প্রথম তিন মাসের মানবাধিকার পরিস্থিতি সেই আশার ভিতকেই নাড়িয়ে দিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার (Odhikar)-এর ২০ মে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে রাষ্ট্রীয় নি’\পী’\ড়ন, রাজনৈতিক সহিংসতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সংকট এবং প্রতিবেশী ভারত (India)-এর আগ্রাসী নীতির উদ্বেগজনক চিত্র।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে অন্তত ১৩ জন নি’\হত এবং ১ হাজার ৩৬৮ জন আহ’\ত হয়েছেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ভোটগ্রহণ তুলনামূলক শান্তিপূর্ণ মনে হলেও ফলাফল গণনা ও ফলাফল “ইঞ্জিনিয়ারিং” নিয়ে ব্যাপক অভিযোগ উঠেছে। এমনকি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট (Bangladesh Supreme Court)-এর হাইকোর্ট বিভাগে ৩৬টি আসনের ফলাফল চ্যালেঞ্জ করে রিট দায়ের করা হয়েছে।
নির্বাচনের পর বিজয়ী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-এর সমর্থকদের বিরুদ্ধে পরাজিত ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমর্থকদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগও প্রতিবেদনে স্থান পেয়েছে।
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অধিকার। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিন মাসে অন্তত ৪ জন বিচারবহির্ভূত হ’\ত্যার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৩ জন নি’\র্যাতনে এবং ১ জন পি’\টু’\নিতে মারা যান। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে নি’\র্যাতনের ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে সেনাবাহিনী কর্তৃক ২১ জন গণমাধ্যমকর্মীকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগকে “চাঞ্চল্যকর” হিসেবে বর্ণনা করেছে সংস্থাটি। এছাড়া কারাগারে দুর্নীতি ও সুচিকিৎসার অভাবে ২১ জন কয়েদির মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও সংকট কাটেনি। সাইবার নিরাপত্তা আইন (Cyber Security Act)-২০২৬ ব্যবহার করে রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রে’\ফতার এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্র তিন মাসে ৬৪ জন সাংবাদিক হামলা, মামলা ও নি’\র্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সীমান্ত পরিস্থিতি এবং ভারতের ভূমিকাকে ঘিরে প্রতিবেদনে বিশেষ উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। অধিকার-এর তথ্যমতে, ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বি’\এসএ’\ফের গু’\লিতে ১ জন বাংলাদেশি নি’\হত এবং ২ জন আহ’\ত হয়েছেন। এছাড়া অন্তত ১৭ জনকে অবৈধভাবে পুশ-ইন করার অভিযোগ আনা হয়েছে। ভারতীয় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলাদেশবিরোধী গুজব এবং অপতথ্য ছড়ানোর বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
এমনকি ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি ক্রিকেটার মুস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার ঘটনাকেও প্রতিবেদনে অপপ্রচারের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
আইনি সংস্কারের ক্ষেত্রেও সরকারের অনাগ্রহের অভিযোগ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ২০টি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশ সংসদে বিল হিসেবে উপস্থাপন না করায় সেগুলো বাতিল হয়ে গেছে। এর মধ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ও গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও রয়েছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এর ফলে ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের পথ আরও সংকুচিত হচ্ছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আবারও পুরোনো স্বৈরাচারী কাঠামোর দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য অধিকার বেশ কিছু সুপারিশও দিয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, বিচারবহির্ভূত হ’\ত্যায় জড়িতদের বিচার নিশ্চিত করা, কারাগারের অব্যবস্থাপনা দূর করা এবং ভারতের আধিপত্যবাদী আচরণের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
