২০২৭ থেকেই বদলে যাচ্ছে পাঠ্যবই, যুক্ত হচ্ছে এআই-রোবটিকসসহ নতুন বিষয়

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে সরকার। বর্তমান সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকার অনুযায়ী পাঠ্যবই পরিমার্জন এবং যুগোপযোগী নতুন শিক্ষাক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে একাধিক নতুন বিষয় যুক্ত করা হচ্ছে, পাশাপাশি দেশের মোট ৬০১টি পাঠ্যবই নতুনভাবে সাজানোর কাজও চলছে বলে জানিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB)।

সম্প্রতি এনসিটিবির চেয়ারম্যান মাহবুবুল হক পাটওয়ারী (Mahbubul Haque Patwari) জানিয়েছেন, মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবই পরিমার্জনের জন্য চারদিনব্যাপী নিবিড় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, গবেষক এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের নিয়ে গঠিত প্রায় ৩২০ জন বিশেষজ্ঞ কাজ করছেন। মাধ্যমিকের ৯৭টি এবং প্রাথমিকের ৩৬টি বই পরিমার্জনের কাজ চলছে।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০২৭ সাল থেকে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘ক্রীড়া ও সংস্কৃতি’, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ এবং সপ্তম শ্রেণিতে ‘জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা’ নামে নতুন বিষয় যুক্ত হবে। একই সঙ্গে ইতিহাস, তথ্যপ্রযুক্তি, সংস্কৃতি, খেলাধুলা ও মানসিক স্বাস্থ্যশিক্ষায় নতুন অধ্যায় সংযোজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশকে গুরুত্ব দিয়ে বইগুলোকে আরো আনন্দময় ও ব্যবহারিক করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শিশুদের শারীরিক কর্মকাণ্ডে আগ্রহী করতে এবং ডিজিটাল আসক্তি কমাতে সাতটি গেমসের ধারণার ভিত্তিতে কিছু বই সাজানো হচ্ছে। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন ষষ্ঠ শ্রেণির জন্য টেকনিক্যাল ও ভোকেশনাল শিক্ষা (টিভিই) সম্পর্কিত একটি নতুন উদ্দীপনামূলক বইও যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

ইতিহাসের পাঠ্যবইয়েও আসছে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। মহান মু’\ক্তিযু’\দ্ধের বিভিন্ন সেক্টর ও ফোর্সের বিস্তারিত বিবরণ, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনা, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া (Khaleda Zia)-র রাজনৈতিক ভূমিকা নতুনভাবে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (Ziaur Rahman)-এর মু’\ক্তিযু’\দ্ধকালীন ও রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কেও বিস্তারিত তথ্য যুক্ত হতে পারে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ইতিহাসের উপস্থাপনাকে আরো তথ্যনির্ভর ও ভারসাম্যপূর্ণ করতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে পাঠ্যবইয়ে ইতিহাসের একপেশে উপস্থাপনা নিয়ে যে বিতর্ক ছিল, সেটি সংশোধনের কথাও বলছে এনসিটিবি।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়েও আনা হচ্ছে আমূল পরিবর্তন। ষষ্ঠ থেকে নবম শ্রেণির বইগুলোতে পুরোনো বিষয় বাদ দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবটিকস, সাইবার নিরাপত্তা, আধুনিক হার্ডওয়্যার ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। শিক্ষাবিদদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে টিকে থাকতে শিক্ষার্থীদের দক্ষ করে তুলতেই এই পরিবর্তন জরুরি হয়ে উঠেছে।

খেলাধুলা ও সংস্কৃতিকেও নতুন শিক্ষাক্রমে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চতুর্থ শ্রেণিতে আলাদা বিষয় চালুর পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়েও খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমকে পাঠ্যক্রমের অংশ করা হবে। এতে ফুটবল, ক্রিকেট, ভলিবল, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস, দাবা এবং দেশীয় সংস্কৃতিভিত্তিক নানা কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত থাকবে। শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হবে সরাসরি অংশগ্রহণ ও ব্যবহারিক কার্যক্রমের ভিত্তিতে।

শুধু বিষয়বস্তু নয়, পাঠ্যবইয়ের ভাষা, শব্দচয়ন, বানান, প্রচ্ছদ, অলংকরণ ও মানচিত্রেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ছবি, প্রবাদ, বাণী ও ক্যাপশন ব্যবহারে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে এনসিটিবি।

এদিকে ২০২৮ সাল থেকে ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। নতুন কারিকুলামের মূল দর্শন হবে ‘অভিজ্ঞতাভিত্তিক শিক্ষা’। এতে বইয়ের সংখ্যা কমে আসবে এবং ব্যবহারিক শিক্ষার পরিধি বাড়বে বলে জানিয়েছেন মাহবুবুল হক পাটওয়ারী।

তিনি বলেন, অতীতে পাঠ্যপুস্তকে ইতিহাসের যে বিচ্যুতি ঘটেছিল, এবার বিশেষজ্ঞ কমিটির মাধ্যমে তা নিরপেক্ষভাবে সংশোধন করা হচ্ছে। মু’\ক্তিযু’\দ্ধে বীরদের অবদান সঠিকভাবে তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসও পাঠ্যবইয়ে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় (Ministry of Primary and Mass Education)-এর প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ বলেছেন, আধুনিক বিশ্ব, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ কর্মবাজারের বাস্তবতায় পুরোনো কারিকুলাম দিয়ে নতুন প্রজন্মকে প্রস্তুত করা সম্ভব নয়। তাই সরকার দক্ষতাভিত্তিক, বাস্তবমুখী এবং সময়োপযোগী শিক্ষাক্রম তৈরিতে কাজ করছে, যা ২০২৮ সাল থেকে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।