ভারতের মধ্যপ্রদেশের ধার শহরের ঐতিহাসিক কামাল মাওলা মসজিদ বা কথিত ভোজশালা কমপ্লেক্সকে ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিতর্ক। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট সম্প্রতি রায় দিয়েছেন, মধ্যযুগীয় এই স্থাপনাটি প্রকৃতপক্ষে হিন্দু দেবী ‘বাগদেবী’র উদ্দেশে উৎসর্গ করা একটি মন্দির ছিল। আদালতের এই রায়ের পর মুসলিমদের ওই চত্বরে প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই সেখানে গেরুয়া পতাকা, ধর্মীয় উল্লাস এবং উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর প্রকাশ্য সমাবেশ ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
রায়ের পর রোববার বিতর্কিত চত্বরে বিপুলসংখ্যক কট্টরপন্থী হিন্দু যুবককে ধর্মীয় সংগীতের তালে নাচতে, ভিডিও ধারণ করতে এবং দেবীর অস্থায়ী মূর্তি স্থাপন করতে দেখা যায়। পুরো এলাকায় বিপুল পুলিশ মোতায়েন ছিল। মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ক্ষোভ, আতঙ্ক ও গভীর উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
দীর্ঘদিন ধরে মসজিদটির মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ৭৮ বছর বয়সী মোহাম্মদ রফিকের কণ্ঠে ছিল অসহায় বেদনা। তিনি বলেন, “শুক্রবার পর্যন্ত এটি আমাদের মসজিদ ছিল। আজ আর নেই। এমন কিছু ঘটবে কখনো ভাবিনি।”
ভারতে ঐতিহাসিক মসজিদকে মন্দির দাবি করার ঘটনা নতুন নয়। ২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) নেতৃত্বাধীন ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party) ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিভিন্ন ঐতিহাসিক মসজিদকে কেন্দ্র করে একই ধরনের দাবি ক্রমশ বেড়েছে। এমনকি বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের অন্যতম তাজমহল (Taj Mahal)-এর নিচেও মন্দিরের অস্তিত্ব খোঁজার চেষ্টা হয়েছে, যদিও এটি কোনো মসজিদ নয়; বরং মোগল আমলের একটি সমাধিসৌধ।
কামাল মাওলা মসজিদ বা ভোজশালা কমপ্লেক্স নিয়ে বিতর্কের শুরু কয়েক দশক আগে। ১৯৫০-এর দশকের শেষ দিকে হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো প্রথম এ স্থাপনার ওপর নিজেদের দাবি তোলে। পরে ২০০৩ সালে আর্কিওলজিক্যাল সার্ভে অব ইন্ডিয়া (Archaeological Survey of India)-এর সঙ্গে হওয়া সমঝোতা অনুযায়ী প্রতি মঙ্গলবার হিন্দুরা এবং প্রতি শুক্রবার মুসলিমরা সেখানে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পেতেন।
কিন্তু সাম্প্রতিক আদালতের রায়ে সেই ভারসাম্য পুরোপুরি বদলে গেছে। আদালত এ স্থানকে ‘বাগদেবী মন্দির’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং মুসলিমদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। যদিও বিকল্প জায়গায় মসজিদ নির্মাণের জন্য আবেদন করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
এই রায়ের ভিত্তি ছিল এএসআইয়ের দুই বছর আগে পরিচালিত জরিপ। তবে মুসলিমপক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি রায়টিকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ ও ভারতের ‘উপাসনালয় আইন, ১৯৯১’-এর পরিপন্থী বলে মন্তব্য করেছেন। ওই আইন অনুযায়ী স্বাধীনতার সময় যেকোনো উপাসনালয়ের ধর্মীয় পরিচয় যেমন ছিল, তা পরিবর্তন করা যাবে না।
ওয়ারসির দাবি, আদালতের রায়ে ব্যবহৃত মানচিত্র ও ঐতিহাসিক নথি বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট দেখা যায় যে কামাল মাওলা মসজিদ ও সিটি প্যালেস সম্পূর্ণ আলাদা স্থান। বিতর্কিত ‘অম্বিকা’ মূর্তিটি মসজিদের জায়গা থেকে পাওয়া গেছে—এই দাবিকেও তিনি “ডাহা মিথ্যা” বলে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম (British Museum)-এ প্রদর্শিত ‘অম্বিকা’ নামের সাদা মার্বেলের মূর্তিকে ঘিরেও নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। হিন্দুপক্ষের দাবি, এটি কথিত ভোজশালা মন্দিরের অংশ ছিল। আদালত ভারত সরকারকে মূর্তিটি দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয় বিবেচনারও পরামর্শ দিয়েছেন।
দক্ষিণ ভারতের হায়দরাবাদের সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি (Asaduddin Owaisi) আদালতের রায়ের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, এএসআই এখন হিন্দুত্ববাদী শক্তির হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তার ভাষায়, “যদি একের পর এক মসজিদকে মন্দিরে রূপান্তর করা হয়, তবে সেটি ভারতের মুসলিমদের ধর্মীয় অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকির বার্তা বহন করে।”
ওয়াইসি আরও বলেন, এ রায়ের মধ্যে ২০১৯ সালে বাবরি মসজিদ মামলায় ভারতের সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রতিফলন রয়েছে। সেই রায়ই নতুন করে ঐতিহাসিক মসজিদ নিয়ে দাবি তোলার পথ খুলে দিয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশবিষয়ক ইতিহাসবিদ অড্রে ট্রুশকে বলেন, বর্তমানে ভারতে বিভিন্ন মসজিদকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে এবং এটি হিন্দু জাতীয়তাবাদের গভীরে থাকা ইসলামভীতির বহিঃপ্রকাশ। তার মতে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত জরিপ ও ইতিহাস ব্যাখ্যার মাধ্যমে মুসলিম সম্প্রদায়কে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে।
বাবরি মসজিদ ধ্বংসের প্রসঙ্গও আবার সামনে এসেছে এ বিতর্কে। ১৯৯২ সালে উগ্র হিন্দুত্ববাদী জনতা ষোড়শ শতকের বাবরি মসজিদ ভেঙে ফেলে। এরপর দেশজুড়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় দুই হাজারের বেশি মানুষ নি’\হত হন, যাদের অধিকাংশই মুসলমান ছিলেন।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৯ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট বিতর্কিত জমিটি রামমন্দির নির্মাণের জন্য হিন্দুদের হাতে তুলে দেন। পরে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে নরেন্দ্র মোদি রামমন্দিরের প্রাণপ্রতিষ্ঠা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে এটিকে “হিন্দু গৌরবের প্রত্যাবর্তন” হিসেবে বর্ণনা করেন।
এরপর থেকেই কাশী, মথুরা ও অন্যান্য ঐতিহাসিক মসজিদ ঘিরে একই ধরনের দাবি আরও জোরালো হতে থাকে। বারানসির জ্ঞানবাপী মসজিদ এবং মথুরার শাহি ইদগাহ মসজিদ নিয়েও এখন আদালতে মামলা চলছে। হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর দাবি, এসব মসজিদ প্রাচীন হিন্দু মন্দিরের ওপর নির্মিত।
ধারের বিতর্কিত ভোজশালা চত্বরে রোববার যখন হিন্দু উপাসকেরা সমবেত হন, তখন স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদেরও সেখানে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়। জেলার জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তাও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেন বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
স্থানীয় হিন্দু সংগঠনের নেতা গোপাল শর্মা এ ঘটনাকে “হিন্দু সভ্যতার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের লড়াই” বলে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষায়, “৭২০ বছর পর আমরা আমাদের দেবীর সম্মান ফিরিয়ে আনতে পেরেছি।”
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, ভারতে কি এখন কার্যত ‘হিন্দু শাসন’-এর নতুন বাস্তবতা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে? ধর্মীয় স্থাপনাকে কেন্দ্র করে একের পর এক রাজনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ পরিচয়কে ক্রমেই সংকটে ফেলছে বলে মনে করছেন অনেক বিশ্লেষক। মুসলিম সম্প্রদায়ের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে আরও বহু ঐতিহাসিক মসজিদ একই ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা


