কো’\রবা’\নি ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং মুসলিম উম্মাহর এক অনন্য ঐতিহ্য। এটি হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর ত্যাগ ও আনুগত্যের স্মারক, একই সঙ্গে ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিআর বা নিদর্শন। সামর্থ্যবান মুসলমানদের জন্য কো’\রবা’\নি শুধু একটি আমল নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বিশেষ মাধ্যম।
কো’\রবা’\নি শব্দটি এসেছে ‘কুরব’ থেকে, যার অর্থ নৈকট্য অর্জন করা। ইসলামী পরিভাষায় জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সূর্যোদয় থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট পশু জবাই করাকে কো’\রবা’\নি বলা হয়।
কো’\রবা’\নির গুরুত্ব ও ফজিলত
সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কো’\রবা’\নি করে না, তার ব্যাপারে হাদিস শরিফে কঠোর সতর্কতা এসেছে। এক হাদিসে বলা হয়েছে, “যার কো’\রবা’\নির সামর্থ্য রয়েছে কিন্তু কো’\রবা’\নি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।” (মুস্তাদরাকে হাকেম : ৩৫১৯)
আরেক হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ফাতেমা (রা.)-কে উদ্দেশ করে বলেন, কো’\রবা’\নির প্রথম রক্তবিন্দু ঝরার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহতায়ালা বান্দার গুনাহ মাফ করে দেন। এ ফজিলত শুধু আহলে বাইতের জন্য নয়; বরং সব মুসলমানের জন্য। (তারগিব ওয়াত তারহিব : ২/১৫৪)
কার ওপর কো’\রবা’\নি ওয়াজিব
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারী, যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার ওপর কো’\রবা’\নি ওয়াজিব। এই সম্পদ জিলহজের ১০ থেকে ১২ তারিখ সূর্যাস্তের মধ্যে যেকোনো সময় থাকলেই কো’\রবা’\নি আবশ্যক হবে।
নিসাবের পরিমাণ হলো—
– সাড়ে ৭ ভরি স্বর্ণ
– অথবা সাড়ে ৫২ ভরি রুপা
– অথবা সমমূল্যের টাকা বা সম্পদ
ব্যবসায়িক পণ্য, অতিরিক্ত জমি, অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র, অতিরিক্ত বাড়ি—সবই নিসাব হিসাবের অন্তর্ভুক্ত হবে।
কো’\রবা’\নির সময়
জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত কো’\রবা’\নি করা যায়। তবে ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর কো’\রবা’\নি করা উত্তম। যেসব এলাকায় ঈদের নামাজ ওয়াজিব, সেখানে নামাজের আগে কো’\রবা’\নি সহিহ হবে না।
রাতেও কো’\রবা’\নি করা জায়েজ, যদিও দিনের বেলায় করা উত্তম।
কোন পশু দিয়ে কো’\রবা’\নি করা যাবে
উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দিয়ে কো’\রবা’\নি করা জায়েজ। হরিণ বা বন্য পশু দ্বারা কো’\রবা’\নি জায়েজ নয়।
পশুর বয়স হতে হবে—
– উট: কমপক্ষে ৫ বছর
– গরু ও মহিষ: কমপক্ষে ২ বছর
– ছাগল: কমপক্ষে ১ বছর
– ভেড়া ও দুম্বা: কমপক্ষে ১ বছর (বিশেষ ক্ষেত্রে ৬ মাস বয়সী হৃষ্টপুষ্ট ভেড়া বা দুম্বা জায়েজ)
এক পশুতে কতজন শরিক হতে পারবেন
ছাগল, ভেড়া বা দুম্বায় একজনের বেশি শরিক হওয়া যাবে না। তবে গরু, মহিষ বা উটে সর্বোচ্চ সাতজন শরিক হতে পারবেন।
শরিকদের অংশ সমান হতে হবে। কারো অংশ এক সপ্তমাংশের কম হলে কারো কো’\রবা’\নি সহিহ হবে না।
যে পশু দ্বারা কো’\রবা’\নি জায়েজ নয়
নিম্নোক্ত ত্রুটিযুক্ত পশু দ্বারা কো’\রবা’\নি জায়েজ নয়—
– স্পষ্ট খোঁড়া পশু
– অতিরিক্ত দুর্বল পশু
– সম্পূর্ণ অন্ধ বা এক চোখ নষ্ট পশু
– অধিকাংশ দাঁত পড়ে যাওয়া পশু
– অর্ধেক বা তার বেশি কান/লেজ কাটা পশু
– গোড়া থেকে শিং ভেঙে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত পশু
তবে সামান্য শিং ভাঙা বা জন্মগত ছোট কান হলে সমস্যা নেই।
গর্ভবতী পশুর হুকুম
গর্ভবতী পশু কো’\রবা’\নি করা জায়েজ। তবে যদি প্রসবের সময় খুব নিকটবর্তী হয়, তাহলে তা মাকরুহ। জবাইয়ের পর বাচ্চা জীবিত পাওয়া গেলে সেটিও জবাই করতে হবে।
কো’\রবা’\নির পশু নিজে জবাই করা
নিজের কো’\রবা’\নির পশু নিজ হাতে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়ে করানো যাবে। তবে জবাইয়ের সময় উপস্থিত থাকা ভালো।
জবাইয়ে একাধিক ব্যক্তি অংশ নিলে প্রত্যেককে ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলতে হবে। কারো পক্ষ থেকে এটি বাদ পড়লে পশু হালাল হবে না।
নির্ধারিত সময়ে কো’\রবা’\নি না করতে পারলে
কো’\রবা’\নির দিনগুলোতে পশু জবাই করতে না পারলে পশুটি সদকা করে দিতে হবে। যদি পরে জবাই করা হয়, তাহলে পুরো গোশত গরিবদের মধ্যে বিলিয়ে দিতে হবে।
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কো’\রবা’\নি
মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কো’\রবা’\নি করা জায়েজ। যদি মৃত ব্যক্তি অসিয়ত করে না যান, তাহলে তা নফল কো’\রবা’\নি হিসেবে গণ্য হবে এবং গোশত নিজেরাও খেতে পারবেন। তবে অসিয়ত করে গেলে পুরো গোশত সদকা করে দিতে হবে।
অন্যের পক্ষ থেকে কো’\রবা’\নি
অন্য কারো ওয়াজিব কো’\রবা’\নি আদায় করতে চাইলে তার অনুমতি নিতে হবে। তবে স্বামী স্ত্রী বা বাবা সন্তানের পক্ষ থেকে অনুমতি ছাড়াও কো’\রবা’\নি করলে তা আদায় হয়ে যাবে।
