রাজধানী ঢাকার ব্যস্ত এক মোড়ে ট্রাফিক সংকেত অমান্য করে গাড়ি চালিয়ে চলে গিয়েছিলেন হান্নান রহমান জীবন। কিছুক্ষণ পরই গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে আসে একটি বার্তা—ট্রাফিক আইন ভাঙার কারণে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা হয়েছে দুই হাজার টাকা জরিমানা। পুরো ঘটনাটি শনাক্ত করেছিল সড়কে বসানো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইচালিত ক্যামেরা।
২৮ বছর বয়সী হান্নান রহমান জীবন (Hannan Rahman Jibon) জানান, ওই ঘটনার পর থেকে তিনি আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক হয়ে গাড়ি চালান। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক চালক দাবি করছেন, কিছু মানুষ ইতোমধ্যে এআই ক্যামেরাকে ফাঁকি দেওয়ার নানা কৌশলও খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
গত মাসে রাজধানীর ট্রাফিক মনিটরিং ক্যামেরাগুলোকে এআই সফটওয়্যারের সঙ্গে যুক্ত করা শুরু করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (Dhaka Metropolitan Police-ডিএমপি)। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা হচ্ছে।
ডিএমপির মুখপাত্র এনএম নাসিরুদ্দিন (NM Nasiruddin) জানান, রাস্তায় স্থাপিত ক্যামেরার লাইভ ফিড ব্যবহার করে এআই সফটওয়্যার কাজ করে। সিগন্যাল অমান্য, লেন ভাঙা কিংবা অবৈধ পার্কিংয়ের মতো অপরাধগুলো সফটওয়্যার নিজেই শনাক্ত করতে সক্ষম।
তিনি বলেন, এই প্রযুক্তি ইতোমধ্যে চালকদের আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে শুরু করেছে। এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০০টি যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ সদরদপ্তরের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে বসে অ্যানালিস্ট শারমিন আফরোজ (Sharmin Afroze) এআই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত সিসিটিভি ক্যামেরার লাইভ ফিড পর্যবেক্ষণ করেন। সফটওয়্যার যেসব যানবাহনকে ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারী হিসেবে চিহ্নিত করে, সেগুলো পরে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যাচাই করেন।
শারমিন আফরোজ জানান, একদিনেই প্রায় ৮০০টি ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা সিস্টেমে ধরা পড়েছে। তবে আপাতত গুরুতর অপরাধগুলোর ক্ষেত্রে জরিমানা করা হচ্ছে, আর অন্যদের পাঠানো হচ্ছে সতর্কবার্তা।
ট্রাফিক সার্জেন্ট এস এম নাজিম উদ্দিন (SM Nazim Uddin) বলেন, এআইভিত্তিক নজরদারি চালুর পর অনেক চালক নিয়ম মেনে চলতে শুরু করেছেন।
তবে প্রযুক্তিটি নিয়ে কিছু বড় চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে স্বীকার করেছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। শারমিন আফরোজ বলেন, অনেক গাড়ির নম্বর প্লেট অস্পষ্ট, ছোট বা এমনভাবে লাগানো থাকে যে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই সমস্যা সমাধানে পুলিশ বর্তমানে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (Bangladesh Road Transport Authority-বিআরটিএ)-এর সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছে। একইসঙ্গে ফুটপাতে মোটরসাইকেল বা গাড়ি চালানোর মতো অপরাধ শনাক্ত করতে নতুন ফিচার যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হাসিব মোহাম্মদ আহসান (Hasib Mohammad Ahsan) মনে করেন, এই ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি সফলতা শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে না। বরং নিয়ম প্রয়োগ কতটা ধারাবাহিকভাবে হচ্ছে, সেটিই বড় বিষয়।
তিনি বলেন, ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকীকরণে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও অতীতে অনেক উদ্যোগ টেকসই হয়নি। কারণ হিসেবে তিনি আইন না মানার প্রবণতা, পরিকল্পনার ধারাবাহিকতার অভাব এবং জবাবদিহির সংকটের কথা উল্লেখ করেন।
উল্লেখ্য, ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চ (National Bureau of Economic Research)-এর এক গবেষণায় ঢাকাকে বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতির শহর হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংক ও বুয়েটের যৌথ গবেষণা অনুযায়ী, ঢাকার সড়কে যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার। অর্থাৎ অনেক সময় গাড়ির চেয়ে হেঁটে চলাই দ্রুত হয়ে দাঁড়ায়।
