যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ-সমাপ্তিকারী চুক্তিকে ইরান ইতোমধ্যেই নিজেদের কূটনৈতিক ও কৌশলগত অর্জন হিসেবে তুলে ধরতে শুরু করেছে। দেশটির কর্মকর্তাদের দাবি, আলোচনার পুরো প্রক্রিয়ায় তেহরানকে কোনো বড় ধরনের ছাড় দিতে হয়নি; বরং শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটনকেই আলোচনার পথে এগিয়ে আসতে হয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Iranian Foreign Ministry)-এর মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ঐতিহাসিক ভাস্কর্যের ছবি প্রকাশ করেন। সেখানে প্রাচীন সাসানীয় সাম্রাজ্যের এক রাজার সামনে একজন রোমান সম্রাটকে মাথা নত করতে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি লেখেন, “রোমানদের মনে, রোম ছিল বিশ্বের অবিসংবাদিত কেন্দ্র। ইরানিরা সেই বিভ্রম ভেঙে দিয়েছিল।”
রোববার এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র (United States) ও ইরান (Iran) একটি প্রাথমিক চুক্তিতে নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। প্রস্তাবিত সমঝোতার আওতায় হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) পুনরায় পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হবে এবং ইরান তাদের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিষ্পত্তির প্রতিশ্রুতি দেবে। তবে চুক্তিটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হয়নি। এটি কার্যকর হতে হলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) এবং ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি (Mojtaba Khamenei)-এর অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
তবে আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ, পরবর্তী দফার আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে। এখন পর্যন্ত ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম কিংবা শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা সম্ভাব্য চুক্তির নির্দিষ্ট শর্ত নিয়ে প্রকাশ্যে বিস্তারিত কোনো মন্তব্য করেননি।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার চূড়ান্ত ফলাফল এখনো পরিষ্কার নয়। তারপরও এটিকে নিজেদের বিজয় হিসেবে উপস্থাপন করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে তেহরানের। কারণ মাত্র দুই মাস আগেও ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছিলেন, “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” ছাড়া ইরানের সঙ্গে কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে দৃশ্যপট ভিন্ন; এখন আলোচনার পথেই এগোতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে।
ইউরোপীয় পররাষ্ট্র সম্পর্ক পরিষদের বিশ্লেষক এলি গেরানমায়েহ মনে করেন, ইরান নিজেদের এমন একটি রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরতে পারছে, যা দুটি পারমাণবিক শক্তিধর দেশের চাপ মোকাবিলা করেও টিকে থাকতে সক্ষম হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীর ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার কারণে তেহরানের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হয়েছে।
অন্যদিকে বিশ্লেষকদের একটি অংশের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রধান কৌশলগত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হয়নি। ইরানের শীর্ষ নেতা ও সামরিক কমান্ডারদের হ’\ত্যার পরও দেশটির শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়েনি। একই সঙ্গে সম্ভাব্য সমঝোতায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি কিংবা আঞ্চলিক মিত্র মিলিশিয়াদের কার্যক্রম নিয়ে কোনো শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি বলেও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।
আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম আমওয়াজ মিডিয়ার সম্পাদক ও বিশ্লেষক মোহাম্মদ আলী শাবানি বলেন, “কিছু দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় ইরানের জন্য বিজয়ের দাবি তোলা সহজ, কারণ বিজয়ের সংজ্ঞাগুলো অনেকটাই একপেশে।” তার মতে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব দেখিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি সংঘাতে জড়িয়েও সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে না গিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব।
বর্তমান সংঘাতের সময় ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং উপসাগরীয় অঞ্চলের কয়েকটি আরব রাষ্ট্রেও হামলা চালায়। যদিও এসব পদক্ষেপের ফলে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিও ক্ষতির মুখে পড়ে। তবু বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করে তেহরান নিজেদের দরকষাকষির অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে।
তবে যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতা ইরানের জন্য সহজ নয়। দেশটির অর্থনীতি ও অবকাঠামোর সামনে এখনো বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। সংঘাত চলাকালে ইস্পাত কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং পেট্রোকেমিক্যাল স্থাপনাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, যদি আলোচনার মাধ্যমে তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল হয় অথবা বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কিছু সম্পদ অবমুক্ত করা যায়, তাহলে তেহরান সেটিকেও বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে প্রচার করবে।
আন্তর্জাতিক সংকট পর্যবেক্ষণ গোষ্ঠীর ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলি ভায়েজের মতে, এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই সমঝোতা কি শুধু যুদ্ধবিরতির পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এটি বাস্তব ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তিতে পরিণত হবে। তার ভাষায়, “এটিকে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় বা ইরানের বিজয় হিসেবে দেখা উচিত নয়। বাস্তবে এই সংঘাত উভয় পক্ষের জন্যই ক্ষয়ক্ষতির পরিস্থিতি তৈরি করেছে।”


