সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে কোরবানি দেওয়ার রীতি মানবসভ্যতার একেবারে শুরুর দিকেই প্রচলিত হয়েছিল বলে ইসলামি ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়। মুসলমানদের বিশ্বাস অনুযায়ী, নবী আদম (আ.)-এর সময় থেকেই কোরবানির ধারণার সূচনা। তবে আজ মুসলিম সমাজে যে পশু কোরবানির প্রচলন রয়েছে, তার সঙ্গে সবচেয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে নবী ইব্রাহীম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর ঘটনা।
মুসলমানদের বিশ্বাস, সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে নবী ইব্রাহীম (আ.) তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানি করার উদ্দেশ্যে মক্কার আরাফাতের ময়দানে নিয়ে যান। তার আনুগত্য ও বিশ্বাসে সন্তুষ্ট হয়ে ইসমাইল (আ.)-এর পরিবর্তে একটি পশু কোরবানি গ্রহণ করা হয়। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতি বছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ মুসলিম বিশ্বে পশু কোরবানির মাধ্যমে ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়।
যদিও ইসলামপূর্ব আরবেও পশু কোরবানির প্রচলন ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (University of Dhaka)-এর ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. আতাউর রহমান মিয়াজী বলেন, তখন কোরবানি করা হতো বিভিন্ন দেব-দেবীর উদ্দেশ্যে। এ কারণে হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কায় অবস্থানকালীন সেই রীতি অনুসরণ করেননি। এমনকি নবুয়ত পাওয়ার পরও বহু বছর তাকে কোরবানি করতে দেখা যায়নি।
ঈদুল আজহার সূচনা ও মদিনার নতুন বাস্তবতা
ইসলামের ইতিহাস অনুযায়ী, ৬১০ খ্রিস্টাব্দে নবুয়ত লাভের পর প্রায় এক যুগ মক্কায় ইসলাম প্রচার করেন নবী সা:। এ সময়ে তাকে নানা নির্যাতন, সামাজিক বয়কট এবং হুমকির মুখে পড়তে হয়। পরিস্থিতি কঠিন হয়ে উঠলে ৬২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন। এই ঘটনাকেই ইসলামের ইতিহাসে ‘হিজরত’ বলা হয় এবং সেখান থেকেই হিজরি সালের সূচনা।
আনাস ইবনে মালিক (রা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, মদিনায় গিয়ে নবী সা: জানতে পারেন স্থানীয়রা ‘নওরোজ’ ও ‘মিহিরজান’ নামে দুটি উৎসব পালন করেন। অধ্যাপক মিয়াজীর ভাষ্য অনুযায়ী, সেই প্রেক্ষাপটে মুসলমানদের জন্যও দুটি ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব প্রবর্তিত হয়।
এর একটি শাওয়ালের প্রথম দিনে পালিত ঈদুল ফিতর, আর অন্যটি জিলহজে পালিত ঈদুল আজহা (Eid-ul-Adha)।
নবী সা:-এর প্রথম কোরবানি: কোন পশু ছিল সেটি?
মুসলিম পণ্ডিতদের মতে, হিজরি দ্বিতীয় সনে প্রথমবারের মতো ঈদুল আজহা উদযাপিত হয়। বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি (Bangladesh National Imam Association)-এর সভাপতি মাওলানা কাজী আবু হোরায়রা বলেন, ওই সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে কোরবানির নির্দেশ আসে এবং নবী সা: প্রথমবার কোরবানি করেন।
ইসলামি গবেষকদের মতে, এর মাধ্যমে ইব্রাহীম (আ.)-এর কোরবানির ঐতিহ্য নতুনভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন (Islamic Foundation)-এর কর্মকর্তা ড. মো. আবু ছালেহ পাটোয়ারী বলেন, ইসলামের অনেক বিধান আগের নবীদের ধারাবাহিকতার অংশ। কোরবানিও সেই ধারারই একটি অনুসরণ।
বুখারী শরীফের ৫৫৫৪ নম্বর হাদিসে আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সা: দুটি সাদা-কালো রঙের শিংওয়ালা দুম্বা নিজের হাতে কোরবানি করেছিলেন।
মিশকাত শরীফেও বর্ণিত হয়েছে, তিনি নাদুস-নুদুস, সুস্থ ও শিংওয়ালা দুম্বা বেছে নিয়েছিলেন। কোরবানির সময় তিনি পশুর ওপর পা রেখে “আল্লাহু আকবার” বলে নিজ হাতে জবাই করেন।
মাওলানা কাজী আবু হোরায়রা বলেন, দুটি দুম্বার মধ্যে একটি ছিল নিজের পক্ষ থেকে, আরেকটি ছিল উম্মতের পক্ষ থেকে।
ইসলামি পণ্ডিতদের মতে, এই ঘটনাই বর্তমান কোরবানি প্রথার অন্যতম ভিত্তি। সেই সময়ও ঈদের নামাজের পর কোরবানি করা হয়েছিল—যে রীতি এখনো অনুসরণ করা হয়।
ড. আবু ছালেহ পাটোয়ারীর ভাষায়, হাদিসে স্পষ্ট বলা আছে—ঈদের নামাজের আগে জবাই করলে তা সাধারণ জবাই হিসেবে গণ্য হবে, কোরবানি হিসেবে নয়।
দুম্বা ছাড়াও যেসব পশু কোরবানি করেছেন নবী সা:
ইসলামি গবেষকদের মতে, হিজরি দ্বিতীয় সন থেকে শুরু করে জীবনের শেষ পর্যন্ত নিয়মিত কোরবানি করেছেন নবী সা:।
তিরমিজি শরীফের উদ্ধৃতি দিয়ে গবেষকরা জানান, হিজরতের পর ১০ বছর মদিনায় অবস্থানকালে প্রতি বছরই কোরবানি করেছেন তিনি।
দুম্বার পাশাপাশি তিনি উট, গরু, মেষ ও ভেড়াও কোরবানি করেছেন। পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে সুস্থ, পরিণত বয়সী, শিংওয়ালা ও মোটাতাজা পশুকে অগ্রাধিকার দিতেন। ভেড়া, মেষ বা দুম্বার ক্ষেত্রে খাসি পশু বেছে নেওয়ার কথাও হাদিসে উল্লেখ রয়েছে।
ইসলামি গবেষকরা জানান, হজ বা ওমরাহর সময় নবী সা: ও তার সঙ্গীরা সঙ্গে কোরবানির পশু নিয়ে যেতেন, যেগুলো ‘হাদি’ নামে পরিচিত ছিল।
ষষ্ঠ হিজরিতে ওমরাহর উদ্দেশ্যে যাত্রার সময় হুদাইবিয়ার সন্ধি (Treaty of Hudaybiyyah)-এর আগে বাধার মুখে পড়ে তিনি সেখানে অবস্থান করেন। পরে সন্ধির পর নিজের ও পরিবারের জন্য উট কোরবানি করেন।
গবেষকদের মতে, ওই সময় তিনি মোট ৬৩টি উট কোরবানি দিয়েছিলেন। কিছু পশুর গায়ে চিহ্ন দিয়ে মক্কার দিকে ছেড়েও দেওয়া হয়েছিল, যাতে বোঝা যায় সেগুলো কোরবানির জন্য নির্ধারিত।
দশম হিজরিতে, অর্থাৎ বিদায় হজের সময়, নবী সা: আনুষ্ঠানিকভাবে হজ পালন করেন এবং ১০০টি উট কোরবানি দেন বলে বিভিন্ন বর্ণনায় উল্লেখ আছে।
ড. আবু ছালেহ পাটোয়ারী জানান, এর মধ্যে ৬৩টি উট নবী করিম সা: নিজ হাতে জবাই করেছিলেন। বাকি পশুগুলো জবাই করেছিলেন হযরত আলী (রা.) (Hazrat Ali RA)।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
