পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার মোদির কৌশল কেন শেষ পর্যন্ত উল্টো চাপ তৈরি করল?

২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর। দক্ষিণ ভারতের কেরালায় এক বিশাল সমাবেশে বক্তৃতামঞ্চে মুষ্টি ঠুকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি (Narendra Modi) ঘোষণা দিয়েছিলেন—পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিচ্ছিন্ন করা হবে। ভারত-শাসিত কাশ্মীরে হামলায় ১৮ ভারতীয় সেনা নি’\হত হওয়ার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, “আমাদের সেনাদের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না।”

কিন্তু প্রায় এক দশক পর সেই রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির ফলাফল নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে। কারণ, পাকিস্তান আজ শুধু আন্তর্জাতিকভাবে সক্রিয় নয়, বরং নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় আরও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক খেলোয়াড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পাকিস্তান (Pakistan) একদিকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও আঞ্চলিক সংকটকে কাজে লাগিয়েছে, অন্যদিকে ভারতের কিছু কৌশলগত সিদ্ধান্তও ইসলামাবাদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেশটি চীন (China)-এর ঘনিষ্ঠ অংশীদার, উপসাগরীয় অঞ্চলে প্রভাবশালী এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনর্গঠন করেছে।

২০২৫ সালের মে মাসে ভারত-পাকিস্তান সংঘাতের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। পাকিস্তান দ্রুত তাকে ধন্যবাদ জানালেও নয়াদিল্লি প্রকাশ্যে সেই কৃতিত্ব স্বীকার করেনি। বিশ্লেষকদের ভাষায়, এখান থেকেই দুই দেশের কূটনৈতিক আচরণের পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানকে দুর্বল ও বিচ্ছিন্ন করার যে কৌশল অনুসরণ করেছে, তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। বরং ২০২৫ সালের সংঘাতের পর পাকিস্তান নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে—এই ধারণা আন্তর্জাতিক মহলে আরও জোরালো হয়েছে।

যুদ্ধবিরতি, ট্রাম্প এবং নতুন সমীকরণ

মে মাসের সংঘাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হয়। কয়েক সপ্তাহ ধরে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার আলোচনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। পাকিস্তান এই আখ্যানকে কূটনৈতিকভাবে কাজে লাগায়।

পরে পাকিস্তান ট্রাম্পকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেয়। একই সময়ে পাকিস্তানি সেনাপ্রধান আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ নতুন বার্তা দেয়—ওয়াশিংটন ইসলামাবাদকে আর উপেক্ষা করছে না।

‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না’—সেই নীতির সীমাবদ্ধতা?

দীর্ঘদিন ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে “কৌশলগত সংযম” নীতি অনুসরণ করেছিল। কিন্তু মোদি সরকারের সময়ে নীতির ভাষা বদলে যায়। “সন্ত্রাস ও আলোচনা একসাথে চলতে পারে না”—এই অবস্থানই হয়ে ওঠে কেন্দ্রীয় বার্তা।

২০১৬ সালের সীমান্তপারের হামলা, ২০১৯ সালের বালাকোট অভিযান—সব মিলিয়ে ভারত সামরিক প্রতিক্রিয়াকে সামনে নিয়ে আসে। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, শক্ত অবস্থান রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় হলেও কূটনৈতিকভাবে সবসময় কার্যকর হয়নি।

সার্ক থেকে দূরত্ব, নতুন আঞ্চলিক বাস্তবতা

২০১৪ সালে ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির কথা বললেও পরে ভারত সার্ক (SAARC)-কেন্দ্রিক কূটনীতি থেকে দূরে সরে যায়। ইসলামাবাদে সম্মেলন বর্জনের পর দক্ষিণ এশিয়ার এই আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে।

ভারত বিমস্টেককে এগিয়ে নিতে চাইলেও সেটি এখনও দক্ষিণ এশিয়ার প্রধান আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠতে পারেনি। এদিকে বাংলাদেশ, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্য এশিয়ায় পাকিস্তান নতুন কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে।

চীন, উপসাগর এবং পাকিস্তানের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বহু পুরোনো। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতে চীনা প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও যুদ্ধবিমান আলোচনায় আসে। একই সময়ে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়িয়েছে ইসলামাবাদ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, পাকিস্তান এখন একইসঙ্গে বেইজিং, ওয়াশিংটন, তেহরান ও রিয়াদের সঙ্গে কাজ করতে পারছে—যা দেশটির নতুন কূটনৈতিক শক্তির উৎস।

ইসরাইল, ইসলামোফোবিয়া ও ভারতের ভাবমূর্তি

গত এক দশকে ইসরাইল (Israel)-এর সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়েছে। কিন্তু সমালোচকদের মতে, গাজায় গ’\ণহ’\ত্যা প্রসঙ্গে নীরবতা এবং মুসলিমবিরোধী বক্তব্য ও নীতির অভিযোগ ভারতের ঐতিহ্যগত ভারসাম্যকে চ্যালেঞ্জ করেছে।

ভারতে মুসলিমদের গ’\ণপি’\টু’\নি, মসজিদ ইস্যু, বৈষম্যমূলক নীতি ও ধর্মীয় উত্তেজনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ জানিয়েছে। পাকিস্তান এসব বিষয় আন্তর্জাতিক ফোরামে তুলে ধরে নিজেদের অবস্থান জোরদার করার চেষ্টা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ভারত সম্পর্কেও নতুন চাপ

দুই দশক ধরে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক দ্রুত এগোলেও ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে সেই সম্পর্ক নতুন পরীক্ষার মুখে পড়ে। শুল্ক, বাণিজ্য, ইরান নীতি, রুশ জ্বালানি এবং এইচ-১বি ভিসা—সব ইস্যুতেই চাপ তৈরি হয়েছে।

ভারতের সাবেক কূটনীতিকদের একাংশ মনে করছেন, ওয়াশিংটন এখন কৌশলগত বিকল্পও খুঁজছে। একই সময়ে পাকিস্তান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আবারও কার্যকর অংশীদার হিসেবে জায়গা করে নিচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ২০১৬ সালে পাকিস্তানকে একঘরে করার যে ঘোষণা দিয়েছিলেন মোদি, প্রায় এক দশক পর এসে সেই নীতির কার্যকারিতা নিয়েই এখন সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে।