জঙ্গল সলিমপুরের ‘স্বঘোষিত রাজা’ ইয়াসিন, সন্ত্রাস, ভূমিদস্যুতা ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই আতঙ্ক, সন্ত্রাস ও অবৈধ দখলদারিত্বের এক আলোচিত জনপদ। এই দুর্গম পাহাড়ি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় থাকা নাম মো. ইয়াসিন, যিনি স্থানীয়ভাবে ‘জামাই ইয়াসিন’ নামে পরিচিত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি শুধু একজন শীর্ষ সন্ত্রাসীই নন, বরং ভূমিদস্যুতা, অবৈধ প্লট বাণিজ্য এবং সশস্ত্র বাহিনী পরিচালনার মাধ্যমে পুরো এলাকায় একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তুলেছেন।

সম্প্রতি আলীনগরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ভয়াবহ সশস্ত্র হা’\মলার পর আবারও আলোচনায় এসেছে তার নাম। অভিযোগ রয়েছে, ২৪ মে গভীর রাতে অন্তত ৩০০ সদস্যের একটি সশস্ত্র দল নিয়ে পরিকল্পিতভাবে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে হা’\মলা চালানো হয়। হা’\মলাকারীদের হাতে একে-৪৭ রাইফেলসহ বিভিন্ন আধুনিক অ’\স্ত্র ছিল।

কে এই ‘জামাই ইয়াসিন’?

স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্যমতে, মো. ইয়াসিন (Md. Yasin) মূলত সীতাকুণ্ডের আলীনগর এলাকার বাসিন্দা। জঙ্গল সলিমপুরে বিয়ে করার কারণে তিনি ‘জামাই ইয়াসিন’ নামে পরিচিতি পান। ২০০৩ সালে নোয়াখালী থেকে চট্টগ্রামে এসে প্রথমে একটি জুট মিলে চাকরি করলেও পরে অপরাধ জগতের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন।

পাহাড় কেটে প্লট তৈরি, অবৈধ দখল, অপরাধীদের আশ্রয় দেওয়া এবং সশস্ত্র বাহিনী গঠনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তিনি পুরো এলাকায় নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। স্থানীয়দের মতে, জঙ্গল সলিমপুরে প্রবেশ করতে বিশেষ পরিচয়পত্র দেখাতে হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের জন্যও এলাকাটি ছিল এক ধরনের নিষিদ্ধ অঞ্চল।

গ্রে’\ফতার, কারাবাস এবং পুনরায় সক্রিয়তা

২০২২ সালের ১৮ জুলাই সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়িবহরে হা’\মলা এবং এক ইউপি সদস্যকে মারধরের ঘটনায় ইয়াসিনকে গ্রে’\ফতার করে পুলিশ। পরে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। ওই ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানা (Sitakunda Police Station)-তে মামলা হয়।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, অ’\স্ত্র, গু’\ম, না’\শকতা ও অন্যান্য অপরাধে তার বিরুদ্ধে ১৫টিরও বেশি মামলা রয়েছে। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

কীভাবে গড়ে উঠেছে অপরাধ সাম্রাজ্য

জঙ্গল সলিমপুরের প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর খাসজমিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে চলছে অবৈধ প্লট বাণিজ্য। পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন, ভূমি দখল এবং অবৈধ ইউটিলিটি সংযোগের বিশাল অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইয়াসিন বাহিনীর হাতে রয়েছে বলে অভিযোগ।

স্থানীয়দের মতে, অবৈধ বিদ্যুৎ, পানির সংযোগ এবং প্লট বাণিজ্য থেকে বিপুল অর্থ আয় করে নিজেদের শক্তিশালী সশস্ত্র নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে এই বাহিনী।

রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন

স্থানীয় সূত্র বলছে, রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ইয়াসিন নিজের অবস্থানও পরিবর্তন করেছেন। অতীতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত থাকলেও বর্তমানে তিনি নিজেকে বিএনপির সাবেক যুগ্ম মহাসচিব আসলাম চৌধুরী (Aslam Chowdhury)-এর অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেন।

তবে আসলাম চৌধুরী গণমাধ্যমে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জঙ্গল সলিমপুরে তার কোনো অনুসারী নেই এবং ঘটনাগুলোর সঙ্গে বিএনপির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

রোকন বাহিনীর সঙ্গে দ্বন্দ্ব

স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল সলিমপুর বর্তমানে দুটি শক্তিশালী সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে বিভক্ত। একদিকে ইয়াসিন বাহিনী, অন্যদিকে রোকন উদ্দিন (Rokon Uddin)-এর নেতৃত্বাধীন রোকন বাহিনী।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এলাকা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব আরও তীব্র হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, সলিমপুরের ছিন্নমূল এলাকা রোকন বাহিনীর এবং আলীনগর অংশ ইয়াসিন বাহিনীর প্রভাবাধীন।

র‍্যা’\ব কর্মকর্তা হ’\ত্যাকাণ্ড

২০২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি জঙ্গল সলিমপুরে অভিযান পরিচালনা করতে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হা’\মলার মুখে পড়ে র‍্যা’\ব-৭ (RAB-7)-এর একটি দল।

এ ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে নি’\হত হন র‍্যা’\ব-৭-এর উপসহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া (Motaleb Hossain Bhuiyan)। এই মামলার প্রধান আসামিদের মধ্যে ইয়াসিনের নাম রয়েছে।

যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে ভয়াবহ হা’\মলা

সবশেষ ২৪ মে গভীর রাতে আলীনগরে যৌথ বাহিনীর ক্যাম্পে সংঘবদ্ধ সশস্ত্র হা’\মলা চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ২৫০ থেকে ৩০০ জনের একটি দল একে-৪৭সহ বিভিন্ন অ’\স্ত্র নিয়ে ক্যাম্প ঘিরে ফেলে।

হা’\মলার সময় পাশের ঘরগুলোর টিনে ছিদ্র করে গুলি চালানো হয়। পাশাপাশি বুলডোজার দিয়ে নির্মাণাধীন যৌথ বাহিনীর একটি ক্যাম্প গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলাচল বাধাগ্রস্ত করতে কয়েকটি সড়কও কেটে দেওয়া হয়েছিল বলে জানা যায়।

প্রশাসনের কঠোর অবস্থান

বর্তমানে সেনাবাহিনী (Bangladesh Army), র‍্যা’\ব ও পুলিশের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ইয়াসিন ও তার সহযোগীদের গ্রে’\ফতারে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি জঙ্গল সলিমপুর পরিদর্শন শেষে সালাহউদ্দিন আহমদ (Salahuddin Ahmed) বলেন, রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করার মতো দুঃসাহস যারা দেখিয়েছে, তাদের সম্পূর্ণ নির্মূল করা হবে। জঙ্গল সলিমপুর, আলীনগর এবং আশপাশের এলাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার কাজ করছে।

এদিকে মাসুদ আলম (Masud Alam), চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার, জানিয়েছেন—ইয়াসিন বাহিনী হোক বা রোকন বাহিনী, অপরাধে জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না। তার মতে, পাহাড় কেটে কোটি কোটি টাকার প্লট বাণিজ্য এবং আধিপত্য রক্ষার লড়াই থেকেই এসব সশস্ত্র সংঘাতের জন্ম হচ্ছে।