পল্লবীর শিশু রামিসা হ’\ত্যা মামলার রায় আজ, নজর এখন ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তে

রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধ’\র্ষ’\ণের পর হ’\ত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া বহুল আলোচিত মামলার রায় আজ ঘোষণা করা হবে। রোববার (৭ জুন) সকাল ৯টার দিকে মামলার দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল (Dhaka Metropolitan Child Violence Suppression Tribunal)-এর বিচারক মাসরুর সালেকীন এ মামলার রায় ঘোষণা করবেন।

গত ১৯ মে পল্লবী (Pallabi)-তে নিজ বাসার পাশের একটি ফ্ল্যাটে ধ’\র্ষ’\ণ ও হ’\ত্যার শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী রামিসা। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, উদ্বেগ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন মহল থেকে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার দাবি ওঠে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আশ্বাস দেওয়া হয়।

ঘটনার দিনই প্রধান আসামি সোহেল রানা (Sohel Rana)-কে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। একই সময়ে আটক করা হয় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তার (Swapna Akter)-কে। পরদিন শিশুটির বাবা পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলায় সোহেল রানাকে প্রধান আসামি এবং তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন এবং দণ্ডবিধির ৩০২ ও ২০১ ধারায় মামলাটি রুজু করা হয়।

তদন্ত চলাকালে ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া বিভিন্ন উপাদান সংগ্রহ করে তদন্ত সংস্থা। তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংগৃহীত সাক্ষ্য-প্রমাণে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি পাওয়া গেছে।

দ্রুত তদন্ত শেষে ২৪ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে বাংলাদেশ পুলিশ (Bangladesh Police)। অভিযোগপত্রে সোহেল রানার বিরুদ্ধে ধ’\র্ষ’\ণ ও হ’\ত্যার এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে অপরাধে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে মামলাটি বিচারের জন্য ট্রাইব্যুনালে পাঠান।

এরপর ১ জুন দুই আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। ২ জুন রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ জন সাক্ষীর মধ্যে ১৬ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন শিশুটির বাবা-মা, বড় বোন, প্রতিবেশী, তদন্ত কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা।

৩ জুন ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় প্রধান আসামি সোহেল রানা নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আদালতের কাছে ক্ষমা চান। অপর আসামি স্বপ্না আক্তারও নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেন।

৪ জুন যুক্তিতর্ক শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষ দাবি করে, সাক্ষ্য-প্রমাণ, ডিএনএ রিপোর্ট, ফরেনসিক আলামত এবং মামলার অন্যান্য উপাদানের মাধ্যমে আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। রাষ্ট্রপক্ষ দুই আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানায়।

বিশেষ পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট আজিজুর রহমান দুলু (Advocate Azizur Rahman Dulu) আদালতকে বলেন, তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘চেইন অব ফ্যাক্ট’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা আসামিদের অপরাধের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক নির্দেশ করে।

অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় খরচে নিয়োজিত আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মুসা কালিমুল্যাহ সোহেল রানার জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে লাশ গুমে সহযোগিতার অভিযোগে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ডের আবেদন জানান।

মামলাটির তদন্ত, অভিযোগপত্র দাখিল, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ, আত্মপক্ষ সমর্থন এবং যুক্তিতর্ক—সব মিলিয়ে মাত্র ১৭ দিনের মধ্যেই বিচারিক কার্যক্রম শেষ হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত এ মামলার রায়কে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।

রায়ের আগে শনিবার অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল বৈঠকে শিশুটির বাবা বলেন, তিনি শুধু নিজের সন্তানের হ’\ত্যার বিচার চান না; তিনি এমন একটি সমাজ ও বিচারব্যবস্থা দেখতে চান, যেখানে আর কোনো শিশুকে এ ধরনের নির্মম ঘটনার শিকার হতে হবে না।

সংশ্লিষ্টদের মতে, আজকের রায়ের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে সোহেল রানা ও স্বপ্না আক্তারের আইনগত পরিণতি। একই সঙ্গে এই মামলার রায় শিশু নির্যাতন এবং নারী-শিশুর বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনায় বিচারিক প্রতিক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।

মামলার নথি অনুযায়ী, রামিসা পপুলার মডেল হাই স্কুল (Popular Model High School)-এর দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। ১৯ মে সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘর থেকে বের হওয়ার পর স্বপ্না তাকে কৌশলে নিজের রুমে নিয়ে যায়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে স্কুলে যাওয়ার জন্য রামিসাকে খুঁজতে শুরু করেন তার মা। একপর্যায়ে আসামির রুমের সামনে শিশুটির জুতা দেখতে পান তিনি। পরে ডাকাডাকিতে কোনো সাড়া না পেয়ে রামিসার বাবা-মা এবং ভবনের অন্য বাসিন্দারা দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন। সেখানে আসামির শয়নকক্ষের মেঝেতে রামিসার মস্তকবিহীন মরদেহ এবং একটি বড় বালতির ভেতরে তার মাথা দেখতে পান তারা।

জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল পাওয়ার পর পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্বপ্নাকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জ জেলার ফতুল্লা থানার সামনে থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এ ঘটনায় ২০ মে ভুক্তভোগী শিশুটির বাবা আব্দুল হান্নান মোল্লা বাদী হয়ে পল্লবী থানায় মামলা দায়ের করেন। সেই মামলারই রায় আজ ঘোষণা হতে যাচ্ছে, যার দিকে এখন তাকিয়ে আছে দেশজুড়ে অসংখ্য মানুষ।