দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে শুধু সনদনির্ভর না রেখে দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে যুক্ত করতে বড় ধরনের পরিবর্তনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে সরকার। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সৃজনশীলতা, নৈতিকতা, প্রযুক্তিজ্ঞান, খেলাধুলা ও উদ্যোক্তা সক্ষমতা বাড়াতে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহদী আমিন (Mahdi Amin)।
সোমবার (৮ জুন) সচিবালয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় (Ministry of Education) এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দেশের শিক্ষা কাঠামোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা শুধু পরীক্ষাভিত্তিক সাফল্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারে।
তার ভাষায়, বর্তমান সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যেখানে সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা, মননশীলতা ও বাস্তব দক্ষতার সমন্বয় ঘটবে। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষার ফল বা সনদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরিবর্তে খেলাধুলা, সংস্কৃতি, নেতৃত্ব, প্রযুক্তি ও কর্মদক্ষতায়ও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।
এই লক্ষ্য সামনে রেখে নতুন পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হচ্ছে কয়েকটি নতুন বিষয়। এর মধ্যে রয়েছে ক্রীড়া শিক্ষা, সংস্কৃতি শিক্ষা, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে একটি নতুন বিষয়। এই উদ্যোগের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নৈতিক মূল্যবোধ, নাগরিক দায়িত্ববোধ, সামাজিক আচরণ ও বাস্তবজীবনভিত্তিক সক্ষমতা তৈরির ওপর জোর দেওয়া হবে।
মাহদী আমিন বলেন, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে কারিগরি শিক্ষা সকল শিক্ষার্থীর জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। পাশাপাশি ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’-এর মাধ্যমে নৈতিকতা, মূল্যবোধ, দায়িত্বশীলতা ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার বিষয়গুলো শেখানো হবে। একই সঙ্গে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিকে আলাদা বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তৃতীয় ভাষা শিক্ষার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিদ্যমান শিক্ষাকাঠামোর মধ্যেই বিস্তৃত অধ্যায়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক যোগাযোগ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।
শিক্ষা ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গত ১৬ বছরে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো একদিনে সমাধান সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের মতামতের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হবে। লক্ষ্য হলো এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা, যেখানে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ, দক্ষতা এবং শিল্পখাতের সঙ্গে বাস্তব সংযোগ থাকবে।
নতুন কারিকুলাম বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন বই প্রণয়ন ও ছাপানোর জন্য সরকারের হাতে মাত্র তিন থেকে চার মাস সময় ছিল। ফলে সব পরিবর্তন একসঙ্গে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। তবে আগামী বছর থেকে সংস্কার কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে।
শিক্ষাক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপরও জোর দিচ্ছে সরকার। তিনি জানান, আগামী কয়েক বছরে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ১৪ লাখ ট্যাব সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে এবং আগামী অর্থবছরের বাজেটেও এ সংক্রান্ত পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ক্রীড়া বিকাশের প্রসঙ্গ টেনে তিনি জানান, প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট (Primary School Gold Cup Football Tournament)-এ এ বছর ২২ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। ইউনিয়ন থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত প্রতিযোগিতা চলছে এবং আগামী ২০ জুন জাতীয় পর্যায়ের ফাইনাল আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞান ও উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়াতে চালু করা হচ্ছে স্টার্ট-আপ, সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং (Start-up, Science Project and Innovation Idea Showcasing) কর্মসূচি। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্থানীয় ও জাতীয় সমস্যার সমাধানে নিজেদের ধারণা উপস্থাপন করতে পারবে। ভালো উদ্ভাবনী ধারণার জন্য সিড ফান্ডিংয়ের ব্যবস্থাও রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় আনার অংশ হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে স্কিলস কম্পিটিশন, ক্যারিয়ার ফেয়ার এবং সরাসরি চাকরির সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষায়, কারিগরি শিক্ষাকে সম্মানজনক শিক্ষাধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায় সরকার, যাতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি হয়।
পরিবেশ সচেতনতা গড়ে তুলতেও থাকছে নতুন উদ্যোগ। ওয়ান স্টুডেন্ট, ওয়ান ট্রি (One Student, One Tree) কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে গাছের চারা তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এ উদ্যোগে যুক্ত করা হবে।
