কাদেরের ঘড়ি থেকে শিবগঞ্জের বরাদ্দ: সাত বছরে দুই অনুসন্ধান, ঘুরেফিরে একই প্রশ্ন

ছবি: সংগৃহীত

দেশের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক ইতিহাসে এমন কিছু প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, যেগুলো কেবল সংবাদজগতেই আলোড়ন তোলেনি, একই সঙ্গে বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে রাজনৈতিক অঙ্গনেও। কখনও সেই বিতর্কের কেন্দ্রে ছিলেন ক্ষমতাসীন সরকারের প্রভাবশালী কোনো মন্ত্রী, কখনও নতুন সরকারের বহুল আলোচিত কোনো প্রতিমন্ত্রী। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চেয়েও বেশি আলোচনায় উঠে এসেছে প্রতিবেদন প্রকাশকারী সংবাদমাধ্যম এবং তার প্রতি রাষ্ট্রের আচরণ।

কানাডাভিত্তিক বাংলা ও ইংরেজি ভাষার অনুসন্ধানী সংবাদমাধ্যম নেত্র নিউজ (Netra News)-এর এমনই দুটি বহুল আলোচিত প্রতিবেদনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান প্রায় সাড়ে ছয় বছর। ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছিল ‘মন্ত্রী কাদেরের ঘড়ির গোলমাল’। আর চলতি বছরের ১৭ জুন প্রকাশিত হয়েছে ‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’।

সময় আলাদা, সরকার আলাদা, প্রতিবেদনের বিষয়বস্তুও আলাদা। তবু দুটি অনুসন্ধানের মধ্যে একটি জায়গায় বিস্ময়কর মিল রয়েছে। দুই প্রতিবেদনের কেন্দ্রেই রয়েছেন ক্ষমতাসীন সরকারের অত্যন্ত প্রভাবশালী দুই রাজনৈতিক ব্যক্তি। একজন ওবায়দুল কাদের (Obaidul Quader), আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং তৎকালীন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। অন্যজন বিএনপি সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম (Mir Shah Alam)।

মিল এখানেই শেষ নয়। মন্ত্রী কিংবা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই দুজনের নাম অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি অথবা ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে রাজনৈতিক ও জনপরিসরের আলোচনায় উঠে আসে।

২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ (Awami League)-এর নেতৃত্বে মহাজোট সরকার গঠনের পর একপর্যায়ে মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পান ওবায়দুল কাদের। মন্ত্রী হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই তাকে ঘিরে নানা বিতর্ক শুরু হয়। এর আগে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তার বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতির মামলা হয়েছিল। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর দলীয় বিবেচনায় বিতর্কিতভাবে সেসব মামলা পর্যায়ক্রমে বাতিল হয়ে যায়। তবে মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেও সময়ের সঙ্গে তার সম্পদ, প্রভাব এবং রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আসতে থাকে।

অন্যদিকে প্রতিমন্ত্রী হওয়ার মাত্র চার মাসের মধ্যে একাধিকবার আলোচনা-সমালোচনার কেন্দ্রে এসেছে মীর শাহে আলমের নাম। দায়িত্ব পাওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ, ঠিকাদারি কাজের বণ্টন এবং স্বজনপ্রীতির অভিযোগে জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়ে উঠেছেন তিনি। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমন কথাও শোনা যাচ্ছে, সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় যেভাবে তার নাম বারবার সামনে আসছে, তা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (Bangladesh Nationalist Party)-এর জন্যও অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠতে পারে।

২০১৯ সালের শেষ দিকে প্রকাশিত ‘মন্ত্রী কাদেরের ঘড়ির গোলমাল’ প্রতিবেদনটির মূল বিষয় ছিল ওবায়দুল কাদেরের জীবনযাপন এবং তার দৃশ্যমান সম্পদের উৎস। প্রতিবেদনে নেত্র নিউজ দাবি করেছিল, একজন হুইসেলব্লোয়ার তাদের কাছে অভিযোগ করেছেন যে কাদের বিভিন্ন সময়ে দামি ব্র্যান্ডের হাতঘড়ি উপহার হিসেবে গ্রহণ করতেন। এমনকি বড় একটি সরকারি চুক্তি অনুমোদনের বিনিময়ে একটি বিলাসবহুল ঘড়ি পাওয়ার অভিযোগও ওই প্রতিবেদনে তোলা হয়েছিল।

অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে নেত্র নিউজ তখন ওবায়দুল কাদেরের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশিত শত শত ছবি বিশ্লেষণ করে। ঘড়ি সংগ্রাহক, বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সহায়তায় ছবিতে তার হাতে দেখা যাওয়া ঘড়িগুলোর সম্ভাব্য মডেল শনাক্ত করার চেষ্টা চালায় সংবাদমাধ্যমটি। প্রতিবেদনে রোলেক্স, উলিস নার্দিন এবং লুই ভিতোঁর মতো বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ডের একাধিক ঘড়ির উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনটির ভাষ্য অনুযায়ী, ছবিতে শনাক্ত করা ঘড়িগুলোর সম্মিলিত বাজারমূল্য এক কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। এর মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় আসে রোলেক্স ডে-ডেট মডেলের একটি ঘড়ি। নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে যার সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২৯ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছিল।

অনুসন্ধানে আরও বলা হয়, নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া ওবায়দুল কাদেরের হলফনামা এবং তার আয়কর-সংক্রান্ত নথিতে ওই ঘড়িগুলোর কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি। সেখান থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে নেত্র নিউজ—একজন মন্ত্রীর ঘোষিত আয় ও সম্পদের সঙ্গে তার দৃশ্যমান জীবনযাপন এবং ব্যবহৃত বিলাসবহুল সামগ্রীর কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না।

ঘড়ি নিয়ে ওই প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। রাজনৈতিক মহলেও নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। তবে পুরো ঘটনায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে নেত্র নিউজকে ঘিরে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অবস্থান।

বাংলাদেশ থেকে নেত্র নিউজের ওয়েবসাইটে প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দেওয়া হয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা হয়। ২০২১ সালের অক্টোবরে আদালত নেত্র নিউজের সম্পাদক, সুইডেনপ্রবাসী সাংবাদিক তাসনিম খলিলসহ চারজনের সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস, রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল তখন এসব পদক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ওবায়দুল কাদেরের ঘড়ি নিয়ে প্রকাশিত অনুসন্ধানটি যতটা আলোচিত হয়েছিল, তার চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছিল সংবাদমাধ্যমটির প্রতি সরকারের প্রতিক্রিয়া। সেই ঘটনার প্রায় সাড়ে ছয় বছর পর আবারও জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে নেত্র নিউজ। তবে এবার আলোচনার বিষয় কোনো মন্ত্রীর হাতঘড়ি নয়; এবার সামনে এসেছে ‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’।

১৭ জুন প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসে স্থানীয় সরকার বিভাগের সড়ক, সেতু এবং অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দে অস্বাভাবিক সুবিধা পেয়েছে বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলা।

নেত্র নিউজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মাত্র চার মাসে শিবগঞ্জের জন্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকার প্রকল্প বরাদ্দ হয়েছে। দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পাওয়া উপজেলা গাজীপুরের কালীগঞ্জের তুলনায়ও শিবগঞ্জের বরাদ্দ দ্বিগুণের বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনটিতে আরও দাবি করা হয়েছে, শিবগঞ্জে বরাদ্দ হওয়া প্রকল্পগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের ছেলে মীর শাকরুল আলম সীমান্তের প্রতিষ্ঠান। এর পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি, যুবদল এবং দলটির সহযোগী সংগঠনের নেতাদের মালিকানাধীন আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের কাছেও বড় অঙ্কের কাজ গেছে।

অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি ছিল সীমিত দরপত্র পদ্ধতি বা এলটিএমের ব্যবহার। নেত্র নিউজের উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, শিবগঞ্জে বরাদ্দ পাওয়া প্রকল্পগুলোর প্রায় ৭১ শতাংশ কাজ এই পদ্ধতির মাধ্যমে দেওয়া হয়েছে। অথচ উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে কাজ দেওয়া হলে আরও বেশি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণের সুযোগ পেত এবং প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার সম্ভাবনাও বাড়ত।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (Transparency International Bangladesh) দীর্ঘদিন ধরেই এলটিএম পদ্ধতির সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে। সংস্থাটির গবেষণায় বলা হয়েছে, বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া এই পদ্ধতির অতিরিক্ত ব্যবহার সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

শিবগঞ্জের ক্ষেত্রে নেত্র নিউজ দাবি করেছে, ৪২ কোটি টাকার একটি প্রকল্পকে মোট ১৬টি অংশে ভাগ করা হয়েছিল। এর মধ্যে পাঁচটি প্যাকেজ পেয়েছে প্রতিমন্ত্রীর ছেলের প্রতিষ্ঠান। আর অবশিষ্ট অংশের বেশির ভাগই গেছে স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মালিকানাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে।

তবে প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম তার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নবঞ্চিত বগুড়ার জন্য তিনি সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে সুপারিশ করেছিলেন। সেই সুপারিশ এবং এলাকার উন্নয়ন-প্রয়োজনের কারণেই বরাদ্দ এসেছে।

ছেলের প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি লাইসেন্সটি অনেক আগেই পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে পরিচালনার জন্য অন্য একজনের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ফলে ওই প্রতিষ্ঠানে তার পরিবার বা ছেলের কোনো স্বার্থ নেই বলে দাবি করেন তিনি।

কিন্তু আইন বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে নেত্র নিউজ বলেছে, পাওয়ার অব অ্যাটর্নির মাধ্যমে কোনো প্রতিষ্ঠান পরিচালনার ক্ষমতা অন্য ব্যক্তিকে দেওয়া হলেও সেটি মালিকানা হস্তান্তরের সমতুল্য নয়। সে কারণে প্রতিষ্ঠানটির কাজ পাওয়া এবং প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব রয়েছে কি না, সেই প্রশ্ন পুরোপুরি দূর হচ্ছে না।

‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’ প্রতিবেদনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক এর রাজনৈতিক প্রতীকী অর্থ। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে গোপালগঞ্জকেন্দ্রিক উন্নয়ন বৈষম্যের অভিযোগ ছিল বিএনপির অন্যতম রাজনৈতিক বক্তব্য। নির্বাচনের আগে বগুড়ার এক জনসভায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও জেলা অথবা এলাকাভিত্তিক পক্ষপাতিত্ব বন্ধ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।

ফলে শিবগঞ্জকে ঘিরে নেত্র নিউজের প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো কেবল একটি উপজেলার উন্নয়ন প্রকল্প কিংবা বরাদ্দের হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এগুলো সরাসরি বিএনপি সরকারের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি, রাষ্ট্রীয় সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং ক্ষমতায় যাওয়ার আগে দেওয়া অঙ্গীকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে।

তবে দুটি প্রতিবেদন প্রকাশের পর সবচেয়ে বড় পার্থক্যটি দৃশ্যমান হয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়ায়। ওবায়দুল কাদেরকে নিয়ে অনুসন্ধান প্রকাশের পর নেত্র নিউজের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশে ওয়েবসাইটটির প্রবেশাধিকার বন্ধ করা হয়েছিল, মামলা হয়েছিল এবং সাংবাদিকদের ওপর আইনি চাপ তৈরি করা হয়েছিল।

অন্যদিকে মীর শাহে আলমকে নিয়ে অনুসন্ধান প্রকাশের পর এখন পর্যন্ত একই ধরনের কোনো ব্যবস্থা দেখা যায়নি। প্রতিবেদনটি বাংলাদেশ থেকে অবাধে পড়া যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও সংবাদমাধ্যমটির ওয়েবসাইট বন্ধ করা, মামলা করা কিংবা সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কোনো খবর সামনে আসেনি।

এই পার্থক্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে স্থায়ী কোনো ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত কি না, সেই প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর দেওয়ার সময় এখনও আসেনি। তবে এটুকু স্পষ্ট, একই ধরনের অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার প্রতি দুই সরকারের আচরণে দৃশ্যমান পার্থক্য রয়েছে। একটি সরকার সমালোচনামূলক অনুসন্ধানের জবাব দিয়েছিল রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে; অন্য সরকারের সময়ে অন্তত এখন পর্যন্ত সংবাদটি প্রকাশ ও প্রচারের সুযোগ অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ক্ষমতার কাঠামো বদলে গেলেও ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিদের নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর চরিত্র খুব বেশি বদলায় না। একসময় প্রশ্ন উঠেছিল ওবায়দুল কাদেরের কব্জিতে থাকা বিলাসবহুল ঘড়ি এবং তার সম্ভাব্য উৎস নিয়ে। এখন প্রশ্ন উঠছে উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ, দরপত্রের পদ্ধতি, পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের কাজ পাওয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ নিয়ে।

সেই অর্থে নেত্র নিউজের দুটি প্রতিবেদন শুধু দুই রাজনৈতিক ব্যক্তির গল্প নয়। এগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, ক্ষমতা ব্যবহারের ধরন, রাষ্ট্রীয় সম্পদ বণ্টন এবং ক্ষমতাবানদের জবাবদিহির প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

আর এ কারণেই প্রায় সাত বছরের ব্যবধানে প্রকাশিত দুটি অনুসন্ধান শেষ পর্যন্ত একই সূত্রে গাঁথা হয়ে যায়। একটিতে ছিল একজন ক্ষমতাধর মন্ত্রীর বিলাসবহুল ঘড়ির গল্প। অন্যটিতে উঠে এসেছে একজন ক্ষমতাধর প্রতিমন্ত্রীর এলাকার উন্নয়ন বরাদ্দ ও ঠিকাদারি রাজনীতির গল্প। কিন্তু দুই ক্ষেত্রেই মূল প্রশ্নটি একই—রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কি জনস্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে, নাকি ক্ষমতার খুব কাছে থাকা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে?

সাংবাদিকতার ভাষায় এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার নামই অনুসন্ধান। আর সেই অনুসন্ধানের কারণেই একসময় আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিল ‘মন্ত্রী কাদেরের ঘড়ির গোলমাল’। আজ একই সংবাদমাধ্যম আবার আলোচনায়, এবার ‘উন্নয়নের শিবগঞ্জ মডেল’ নিয়ে।