দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ঠিক আগে নিজের নামে একটি মিমকয়েন চালু করেছিলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump)। এই উদ্যোগের মাধ্যমে তিনি যেমন ক্রিপ্টোকারেন্সিবান্ধব অবস্থানের বার্তা দেন, তেমনি এটি তার পরিবারের জন্যও বড় ধরনের আয়ের উৎসে পরিণত হয়।
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) প্রকাশিত দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (The Wall Street Journal)-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
বিভিন্ন আর্থিক তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে ক্রিপ্টোসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাত থেকে ট্রাম্পের আয় ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি হয়েছে। তবে তার নামে চালু হওয়া মিমকয়েনে বিনিয়োগকারী অধিকাংশ মানুষ একই ধরনের সাফল্য পাননি। টোকেনটির মূল্য ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক বিনিয়োগকারী বড় অঙ্কের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
কয়েন মার্কেট ক্যাপ (CoinMarketCap)-এর তথ্য অনুযায়ী, বাজারে আসার পর ট্রাম্প মিমকয়েনের বাজারমূল্য প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর মূল্য দ্রুত কমে বর্তমানে প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। অর্থাৎ শুরুর তুলনায় বাজারমূল্য ৯৭ শতাংশেরও বেশি কমেছে।
তবে টোকেনের মূল্যপতন ট্রাম্পের আর্থিক অবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলেনি। কারণ, তার আয়ের প্রধান উৎস ছিল টোকেনের বাজারদর নয়; বরং লেনদেন ফি, লাইসেন্সিং আয় এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম।
সম্প্রতি নর্থ ডাকোটা সফরের আগে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প দাবি করেন, তার সম্পদ বৃদ্ধির মূল কারণ শেয়ারবাজারের ঊর্ধ্বগতি। তার ভাষ্য, শেয়ারবাজার ভালো করায় সবাই লাভবান হয়েছেন এবং তিনিও তার ব্যতিক্রম নন।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গত বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ট্রাম্পের সম্পদ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে ক্রিপ্টোসংশ্লিষ্ট ব্যবসা থেকে। তবে সেটি সরাসরি ক্রিপ্টোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আয়ের উৎস থেকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প মিমকয়েনের মোট সরবরাহের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান সিআইসি ডিজিটাল এবং ফাইট ফাইট ফাইট এলএলসি। ফলে বাজারে টোকেনের কেনাবেচা অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত লেনদেন ফি থেকে আয় করতে পারে।
এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নিজের আর্থিক বিষয়গুলোর দেখভালের দায়িত্ব তিনি তার প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানদের হাতে তুলে দিয়েছেন। তার দাবি, এটি আইন অনুযায়ী করা হয়েছে। বিনিয়োগসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত তার সন্তান ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নেয় এবং তিনি এসব বিষয়ে সরাসরি জড়িত নন।
ক্রিপ্টোসম্পদ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, এসব বিষয়ে তিনি অবগত থাকলেও এতে কোনো আইনি সমস্যা আছে বলে মনে করেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প মিমকয়েনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—টোকেনের দাম বাড়ুক বা কমুক, প্রতিবার কেনাবেচা হলেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান আয় করে। ফলে বাজারমূল্য কমলেও লেনদেন চলতে থাকলে রাজস্ব প্রবাহ অব্যাহত থাকে।
এ ছাড়া ট্রাম্পের দুই ছেলে এরিক ট্রাম্প ও ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল এলএলসির বিভিন্ন টোকেন বিক্রি থেকেও কয়েক শ কোটি ডলারের বেশি আয় হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, মিমকয়েন সাধারণত প্রচলিত ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। এসব টোকেনের মূল্য মূলত বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ এবং বাজারের জল্পনার ওপর নির্ভর করে। ফলে খুব অল্প সময়েই যেমন মূল্য বাড়তে পারে, তেমনি দ্রুত বড় ধরনের পতনও ঘটতে পারে। এ কারণেই মিমকয়েনকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ট্রাম্প ও তার স্ত্রী মেলানিয়ার নামে চালু হওয়া টোকেনের ক্ষেত্রে শুরুতে জানানো হয়েছিল, নির্দিষ্ট সময়ের আগে সব টোকেন একসঙ্গে বিক্রি করা যাবে না; বরং ধাপে ধাপে তিন বছরে বাজারে ছাড়া হবে। এর মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
অনেক বিনিয়োগকারী ট্রাম্পকে সমর্থন জানাতে অথবা ভবিষ্যতে টোকেনের মূল্য বাড়ার আশায় এটি কিনেছিলেন। আবার বড় অঙ্কের কিছু বিনিয়োগকারীর ধারণা ছিল, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ টোকেন কিনলে ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ বা বিশেষ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাওয়া যেতে পারে।
গত মে মাসে ট্রাম্প মিমকয়েনের শীর্ষ ২২০ জন বিনিয়োগকারীর জন্য একটি বিশেষ ব্ল্যাক-টাই ডিনারের আয়োজন করা হয়। সেখানে সবচেয়ে বড় ২৫ জন বিনিয়োগকারী প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলাদা ভিআইপি সংবর্ধনায় অংশ নেওয়ার সুযোগ পান।
সব মিলিয়ে, গত এক বছরে ট্রাম্পের মিমকয়েন অধিকাংশ বিনিয়োগকারীর জন্য লাভজনক হয়নি। তবে এই প্রকল্প থেকে সবচেয়ে বেশি আর্থিক সুবিধা পেয়েছেন ট্রাম্প এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো।


