দীর্ঘ ১৩ বছর পার হলেও খুলনা শিপইয়ার্ড সড়ক (Khulna Shipyard Road) প্রশস্তকরণ প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি (Nasimul Gani)। প্রকল্প এলাকা সরেজমিনে পরিদর্শনে গিয়ে কাজের ধীরগতি, পরিকল্পনার অসংগতি এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় গুরুতর ত্রুটি দেখে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তিরস্কার করেন তিনি।
শনিবার (৪ জুলাই) প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এ সময় স্থানীয় বাসিন্দারা তার কাছে দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির নির্মাণকাজ বন্ধ থাকার কারণে সৃষ্টি হওয়া দুর্ভোগের কথা তুলে ধরেন। বছরের পর বছর কাজ অসমাপ্ত পড়ে থাকায় চলাচলে ভোগান্তিসহ নানা সমস্যার মুখে পড়ার কথাও জানান তারা।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে সড়কের একপাশে নির্মিত স্লুইসগেটের সামনেই বাঁধ দিয়ে পানি নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে রাখার বিষয়টি নাসিমুল গনির নজরে আসে। এমন অব্যবস্থাপনা দেখে তিনি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দেওয়া ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে না পেরে তাকে উদ্দেশ করে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আমাকে দেখে কি বেকুব মনে হয় তোমার? তুমি এখান থেকে পানি বের হওয়ার রাস্তা তৈরি করেছ। পানি যাতে ঢুকতে না পারে সেজন্য স্লুইসগেট করেছ। আবার তার সামনে দিয়ে রেখেছ বাঁধ। এর মানেটা কী?’
সড়কের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় এমন অসংগতি কীভাবে রাখা হয়েছে, তা নিয়েও সংশ্লিষ্টদের কাছে প্রশ্ন তোলেন তিনি। পরিদর্শনের সময় প্রকল্পের বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখার পাশাপাশি নির্মাণকাজের গুণগত মান, সড়কের নকশা এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি পর্যবেক্ষণ করেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাধিক প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেন তিনি।
খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (Khulna Development Authority) বা কেডিএ সূত্রে জানা গেছে, ২০১৩ সালের ৭ মে একনেক (Executive Committee of the National Economic Council) সভায় শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। প্রাথমিকভাবে প্রকল্পটির ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৯৮ কোটি টাকা।
পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের ২১ জুলাই দ্বিতীয় দফায় প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়। সে সময় ব্যয় ৯৮ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করার শর্তে ওই সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক হয়নি। সংশোধনের পরও বছরের পর বছর প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত থেকে যায়।
দ্বিতীয় সংশোধনেরও প্রায় ছয় বছর পর গত ৯ জুন প্রকল্পটি তৃতীয় দফায় সংশোধনের প্রস্তাব একনেক সভায় উপস্থাপন করা হয়। নতুন প্রস্তাবে প্রকল্পের ব্যয় আরও বাড়িয়ে ২৮০ কোটি টাকা করার কথা বলা হয়েছিল। তবে দীর্ঘ ১৩ বছরেও প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (Tarique Rahman)।
প্রকল্প বাস্তবায়নে এত দীর্ঘ সময় লাগার কারণ অনুসন্ধান এবং বিলম্বের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে ব্যয় বাড়িয়ে আনা তৃতীয় সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবটিও ফেরত পাঠানো হয়।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর প্রকল্পটির বিলম্ব, বর্তমান অবস্থা এবং কাজের মান খতিয়ে দেখতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনিকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির অন্য দুই সদস্য হলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. নজরুল ইসলাম এবং বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (Implementation Monitoring and Evaluation Division) বা আইএমইডির সচিব সিরাজুন নূর চৌধুরী।
প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন নাসিমুল গনি। তিনি বলেন, কেন এত দিনেও সড়কটির কাজ শেষ হয়নি, বর্তমানে প্রকল্পের কী অবস্থা এবং বাস্তবায়িত কাজের মান কেমন—এসব বিষয় তদন্ত কমিটির সদস্যরা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেছেন।
মন্ত্রিপরিষদ সচিব আরও জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে যাতে দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা প্রকল্পটির কাজ শেষ করা যায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।

