রাজধানীর মোহাম্মদপুর (Mohammadpur) কলেজগেট এলাকায় ছয়তলা মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ার (Muktijoddha Tower) ভবনের ভেতরেই গড়ে উঠেছে ছয়টি হাসপাতাল-ক্লিনিক ও একটি ব্লাড ব্যাংক। গুরুতর অনিয়মের অভিযোগে মাত্র তিন মাস আগে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (Directorate General of Health Services)। কিন্তু সেই নির্দেশ এখন যেন শুধু কাগজেই আটকে আছে। সরেজমিনে দেখা গেছে, বন্ধ ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশই আবার আগের মতো রোগী ভর্তি, অস্ত্রোপচার, আইসিইউ সেবা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষাসহ সব কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ভুয়া চিকিৎসকের মাধ্যমে রোগী দেখানো, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অনুপস্থিতি, অনুমোদন ছাড়াই আইসিইউ পরিচালনা, প্রয়োজনীয় চিকিৎসক-নার্স ও অন্যান্য জনবলের ঘাটতি, দুর্বল অবকাঠামো এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়েছিল। একই সময়ে রাজধানীর চানখাঁরপুল (Chankharpul) এলাকার কয়েকটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
তবে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। সরকারি নির্দেশ অমান্য করে বন্ধ ঘোষিত এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই আবার পুরোদমে চালু হয়েছে। রোগী ভর্তি থেকে অস্ত্রোপচার, আইসিইউ পরিচালনা, প্যাথলজি পরীক্ষা ও অন্যান্য চিকিৎসাসেবা—সবই চলছে প্রায় নির্বিঘ্নে। এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্সের মেয়াদ কয়েক বছর আগে শেষ হয়ে গেলেও নবায়ন ছাড়াই ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো বছরের পর বছর নিয়মনীতি উপেক্ষা করে অবৈধভাবে চিকিৎসা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে।
অনিয়মের এই চিত্র অবশ্য শুধু কয়েকটি বন্ধ ঘোষিত হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, চিকিৎসাসেবার নামে ন্যূনতম নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে অসংখ্য হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকটিতেই মানসম্মত রোগ নির্ণয়ের যন্ত্রপাতি, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, প্রশিক্ষিত নার্স, দক্ষ ল্যাব টেকনোলজিস্ট কিংবা বিএমডিসি নিবন্ধিত চিকিৎসক নেই।
কোথাও ছোট ছোট কয়েকটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম চলছে। কোথাও আবার জরাজীর্ণ, অপরিচ্ছন্ন ও অস্বাস্থ্যকর ভবনে রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে এনে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করার অভিযোগও রয়েছে। রোগীদের উন্নত চিকিৎসার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তাদের অনেকেই মানহীন সেবা, অতিরিক্ত খরচ এবং অনিরাপদ পরিবেশের মুখোমুখি হচ্ছেন।
অনেক হাসপাতাল-ক্লিনিক যে ভবনে চলছে, সেই ভবনের নিচতলায় রয়েছে ভাঙারির দোকান, রাসায়নিক পণ্যের গুদাম, পরিবহন প্রতিষ্ঠানের কার্যালয় কিংবা অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম। রোগী, স্বজন ও চিকিৎসাকর্মীদের ওঠানামার জন্য ব্যবহৃত সিঁড়িগুলোও অত্যন্ত সংকীর্ণ। অসুস্থ রোগীকে স্ট্রেচারে করে ওঠানো-নামানোর মতো পর্যাপ্ত জায়গাও অনেক ভবনে নেই।
নোংরা, স্যাঁতস্যাঁতে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগেই অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা কিংবা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার ন্যূনতম প্রস্তুতি দেখা যায়নি। অথচ ভবনের বাইরে বড় বড় সাইনবোর্ডে ক্যানসার, মেডিসিন, সার্জারি, গাইনি ও অন্যান্য বিভাগের একাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।
বাস্তবে সাইনবোর্ডে থাকা চিকিৎসকদের অধিকাংশই নিয়মিত এসব প্রতিষ্ঠানে বসেন না। রোগী এলে প্রয়োজন অনুযায়ী অনকলে চিকিৎসক ডেকে আনা হয়। অভিযোগ রয়েছে, কখনো কখনো জটিল অস্ত্রোপচারও খণ্ডকালীন বা অনকলে আসা চিকিৎসকের মাধ্যমে সম্পন্ন করা হচ্ছে। অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রোগীর পর্যবেক্ষণ, জরুরি পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের উপস্থিতি এবং প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবার বিষয়গুলোও অনেক ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো রোগীর মৃ’\ত্যু কিংবা বড় ধরনের দু’\র্ঘটনা ঘটলেই কেবল প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিলেও অসাধু কর্মকর্তা ও প্রভাবশালীদের তদবিরে অল্প সময়ের মধ্যেই সেগুলো আবার চালু হয়ে যায়। ফলে মানহীন চিকিৎসাসেবা, ভুল রোগ নির্ণয়, অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ বছরের পর বছর চলতে থাকে।
এই পরিস্থিতিতে রোগীরা একদিকে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন, অন্যদিকে চিকিৎসার নামে আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অনেক পরিবার সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের প্ররোচনায় এসব প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তুলনামূলক বেশি অর্থ খরচ করেও প্রত্যাশিত সেবা পাচ্ছে না। অভিযোগ করার পরও কার্যকর প্রতিকার না পাওয়ায় অনিয়মের এই চক্র আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
গত মার্চে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন (Sardar Md. Sakhawat Hossain) রাজধানীর কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আকস্মিক পরিদর্শন করেন। ওই পরিদর্শনে গুরুতর অনিয়ম ধরা পড়ার পর তার নির্দেশে ২৩, ২৪ ও ২৫ মার্চ টানা অভিযান পরিচালনা করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
টানা তিন দিনের অভিযানে চারটি হাসপাতাল ও ছয়টি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে দুটি হাসপাতালের আইসিইউ ও এনআইসিইউতে নতুন রোগী ভর্তি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর তখন জানিয়েছিল, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
অভিযানে মিরপুর রোডের ডক্টরস কেয়ার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, মোহাম্মদপুরের টিজি মাল্টি স্পেশালাইজড হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চানখাঁরপুলের আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতাল এবং অথেনটিক হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া প্রাইম অর্থোপেডিক অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল ও যমুনা হাসপাতালের আইসিইউ এবং এনআইসিইউতে রোগী ভর্তি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই অভিযানে রয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, অ্যাকটিভ ব্লাড ব্যাংক, প্রাইম টিজি ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, ঢাকা ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার, পিউর সায়েন্টিফিক ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং অ্যাডভান্সড হেলথ এইডের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
অভিযানে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে প্যাথলজিস্ট ও রেডিওলজিস্টের অনুপস্থিতি, পর্যাপ্ত জায়গার অভাব, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা অবকাঠামোর ঘাটতি পাওয়া যায়। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত সংখ্যক প্রশিক্ষিত নার্স ও টেকনোলজিস্টও ছিল না। কোথাও লাইসেন্সের শর্ত অনুযায়ী সেবা দেওয়ার প্রস্তুতি না থাকলেও রোগী ভর্তি রেখে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছিল।
সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী, ১০ শয্যার একটি ক্লিনিক পরিচালনার জন্য চিকিৎসক, পোস্ট-অপারেটিভ রুম, লেবার রুম, নার্স স্টেশন, স্টেরিলাইজেশন রুম, চিকিৎসাবর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং রোগী ও স্বজনদের জন্য অপেক্ষমাণ কক্ষসহ অন্তত ১৩ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, যেসব অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল, তার বেশিরভাগই এখনো বহাল রয়েছে।
মোহাম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারে গিয়ে দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ আশপাশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী এনে ভবনের ক্লিনিকগুলোতে ভর্তি করা হচ্ছে। নিয়মিত চিকিৎসক না থাকায় অনকলে চিকিৎসক ডেকে রোগী দেখানোর ব্যবস্থাও চালু রয়েছে। রোগী ভর্তি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্যান্য চিকিৎসাসেবা আগের মতোই চলছে।
যমুনা হাসপাতাল ও রয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনে শেষ হয়েছে। এরপরও লাইসেন্স নবায়ন না করেই প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। রয়েল মাল্টিস্পেশালিটি হাসপাতালের অনুমোদন রয়েছে ১০ শয্যার। তবে সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৯টি শয্যা ব্যবহার করতে দেখা যায়।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে দালালের মাধ্যমে ঢাকা হেলথ কেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এক রোগীর স্বজন আঙ্গুরি বেগম বলেন, তিন দিন ধরে রোগী ভর্তি থাকলেও সেবার মান সন্তোষজনক নয়। হাসপাতালের পরিবেশও অস্বাস্থ্যকর। অথচ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় এখানে চিকিৎসা খরচ বেশি বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে ঢাকা হেলথ কেয়ার হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিধান রায় আমার দেশের কাছে দাবি করেন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে তাদের প্রতিষ্ঠানে কোনো অনিয়ম পাওয়া যায়নি। সে কারণেই তারা স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন বলে জানান তিনি।
মুক্তিযোদ্ধা টাওয়ারের এসব প্রতিষ্ঠানে ২০২১ সালেও অভিযান চালিয়েছিল স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। সে সময় নানা অনিয়ম ধরা পড়ার পর ভবনটির অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কয়েক বছর পর আবারও একই ধরনের অভিযোগে অভিযান হলেও বন্ধের নির্দেশ কার্যকর থাকছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড এলাকাতেও হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের একই ধরনের চিত্র পাওয়া গেছে। শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে গ্রিন হেলথ হাসপাতাল ও মেডিএইড ডায়াগনস্টিক সেন্টার বন্ধ দেখা যায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, মূলত মিটফোর্ড হাসপাতাল থেকে রোগী এনে এসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়।
তাদের দাবি, শুক্রবার মিটফোর্ড হাসপাতালের স্বাভাবিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় আশপাশের এসব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারও বন্ধ রাখা হয়েছে। অথচ হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টার ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নিয়ম রয়েছে। সরকারি হাসপাতালের কার্যক্রম ও রোগীর উপস্থিতির ওপর নির্ভর করেই আশপাশের অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মিটফোর্ডের এস আহমেদ মার্কেটে অবস্থিত ইস্টার্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গিয়ে দেখা যায়, মাত্র দুটি ছোট কক্ষ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ভবনের ওপরের তলায় ওঠার সিঁড়ি এতটাই সরু যে একজন সুস্থ মানুষের চলাচলেও অসুবিধা হয়। অসুস্থ বা চলাচলে অক্ষম রোগীদের সেখানে ওঠানো-নামানো আরও কঠিন।
প্রতিষ্ঠানটিতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, অপারেশন থিয়েটার কিংবা মানসম্মত পরীক্ষাগার দেখা যায়নি। অথচ বাইরের সাইনবোর্ডে ছয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম ঝুলছে। চিকিৎসকদের নাম ব্যবহার করে রোগী আকৃষ্ট করা হলেও তারা নিয়মিত প্রতিষ্ঠানটিতে বসেন কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
বাঁধন হাসপাতালেও প্রায় একই চিত্র দেখা গেছে। সেখানে সরেজমিনে কোনো চিকিৎসক বা নার্স উপস্থিত পাওয়া যায়নি। তবে হাসপাতালের সাইনবোর্ডে ১২ জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের নাম লেখা ছিল। রিসিপশনে বসে থাকা একজন আয়া জানান, কোনো রোগী সিরিয়াল দিলে তারা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। এরপর চিকিৎসক এসে রোগী দেখেন।
ওই আয়া আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করা হয়। তবে নিয়মিত চিকিৎসক, নার্স ও প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল না থাকলে এসব পরীক্ষা কার তত্ত্বাবধানে এবং কীভাবে সম্পন্ন হচ্ছে, সে প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া যায়নি।
মেডিসান হেলথ কেয়ারে টাঙানো লাইসেন্সের ছবিতে দেখা যায়, এর মেয়াদ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতেই শেষ হয়ে গেছে। মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স প্রদর্শন করেই প্রতিষ্ঠানটি কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। লাইসেন্স নবায়ন করা হয়েছে কি না, তার কোনো প্রমাণও সেখানে পাওয়া যায়নি।
চানখাঁরপুল এলাকায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অভিযানে বন্ধ হওয়া প্রাইম টিজি ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টার এবং আহমেদ স্পেশালাইজড হাসপাতালে রোগী ভর্তি অবস্থায় পাওয়া গেছে। যেসব অনিয়ম ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে প্রতিষ্ঠান দুটির কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল, সেগুলোরও দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি।
আগের মতোই নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম চলছে। কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত নার্সের পরিবর্তে রিসেপশন কর্মচারী এবং আয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন সেবা পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। চিকিৎসাসেবার মতো সংবেদনশীল কাজেও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ না থাকা কর্মীদের ব্যবহার করা হচ্ছে।
অ্যাকটিভ ব্লাড ব্যাংক, ক্রিয়েটিভ ব্লাড ব্যাংক ট্রান্সফিউশন অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, চৌধুরী জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার, আস সুন্নাহ স্পেশালাইজড হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং দি প্যাথলজি সেন্টারে গিয়ে চিকিৎসক বা নার্স কাউকেই পাওয়া যায়নি।
এসব প্রতিষ্ঠানে নারী ও পুরুষ রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড, কেবিন কিংবা টয়লেটের ব্যবস্থাও নেই। ছোট ছোট খুপড়ির মতো কয়েকটি কক্ষে রোগীদের রাখা হচ্ছে। হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার জন্য যেসব নিয়মকানুন মেনে চলার কথা, তার অধিকাংশই এখানে কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ।
অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের বাইরে লাগানো সাইনবোর্ডে এমবিবিএস, বিডিএস, বিডিএ, ডেন্টাল সার্জন এবং দন্তরোগ বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন চিকিৎসকের নাম লেখা রয়েছে। বাস্তবে তারা নিয়মিত উপস্থিত না থাকলেও নামের তালিকা দেখিয়ে রোগীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রাইম টিজি ডায়াগনস্টিক অ্যান্ড কনসালটেশন সেন্টারে আসা শিউলি নামের এক রোগী আমার দেশকে জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে কোনো নার্স নেই। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীর শরীর থেকে রক্ত নেওয়ার কাজও আয়ারা করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। তবে প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী অভিযোগটি অস্বীকার করেছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বড় সরকারি হাসপাতালগুলোর আশপাশে দালালচক্র ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সহায়তায় বহু হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার লাইসেন্সের শর্ত পূরণ না করেই বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। সরকারি হাসপাতাল থেকে রোগী এনে এসব প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বা পরীক্ষা করানোর মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ বাণিজ্যিক চক্র গড়ে উঠেছে।
প্রশাসনের অভিযান কিছুদিনের জন্য দৃশ্যমান প্রভাব ফেললেও নিয়মিত ও কার্যকর নজরদারির অভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই বন্ধ প্রতিষ্ঠানগুলো আবার চালু হয়ে যায়। ফলে একই অনিয়মের জন্য বারবার অভিযান পরিচালিত হলেও পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন হচ্ছে না। বন্ধের নির্দেশ বাস্তবায়ন ও পরবর্তী তদারকির দুর্বলতাকেই এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (Bangladesh Private Hospital, Clinic and Diagnostic Owners Association)-এর মহাসচিব ডা. এ এম শামীম আমার দেশকে বলেন, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য প্রতি বছর লাইসেন্স নবায়ন করা বাধ্যতামূলক। কোনো প্রতিষ্ঠান বিধিমালা লঙ্ঘন করলে প্রশাসন অবশ্যই তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।
একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, দেশের অনেক বেসরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ খাতে আরও কার্যকর জবাবদিহি ও তদারকি প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল ও ক্লিনিক শাখার সহকারী পরিচালক মাহমুদুর রহমান আমার দেশকে বলেন, অভিযানে বন্ধ করে দেওয়া হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো আবার চালু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তার কাছে কোনো তথ্য নেই। বিষয়টি সম্পর্কে অধিদপ্তরের পরিচালক বিস্তারিত জানাতে পারবেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট পরিচালক ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বন্ধ ঘোষিত প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে আবার কার্যক্রম শুরু করেছে এবং তাদের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে অধিদপ্তরের অবস্থানও জানা যায়নি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নিয়মিত মনিটরিং, কঠোর লাইসেন্স ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত জনবল এবং জবাবদিহিমূলক তদারকি প্রয়োজন।
তার মতে, বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরকারের কার্যকর সমন্বয় থাকতে হবে। একই সঙ্গে নিয়মিত ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত না করা গেলে বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে না।
