টানা ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব’\ন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড (Bangladesh Water Development Board)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১০টি নদ-নদীর পানি বর্তমানে বি’\পৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফেনী, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল। সুরমা, কুশিয়ারা, মাতামুহুরী ও সাঙ্গু নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। টানা বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকিও বেড়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ধ’\সে ৩০ জন নি’\হত হয়েছেন। আবহাওয়াবিদদের মতে, এবারের বর্ষার এই উগ্র রূপ শুধু অস্বাভাবিকই নয়, গত চার দশকের রেকর্ডেও এমন পরিস্থিতি দেখা যায়নি।
দুর্গত এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ খাবার পানির সংকট। লাখো মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনায় বেগ পেতে হচ্ছে। দুর্গম এলাকায় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নৌযান ও বিমান বাহিনীর সহায়তায় উদ্ধার কার্যক্রম আরও জোরদারের তাগিদ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তর (Bangladesh Meteorological Department)-এর কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের বর্ষণে স্বল্প সময়ে অস্বাভাবিক মাত্রায় বৃষ্টিপাত হয়েছে, যা গত কয়েক দশকের তুলনায় ব্যতিক্রম। জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান (Bazlur Rahman) জানান, জুলাই মাসে একদিনে এত বেশি বৃষ্টিপাত গত ৪০ বছরের রেকর্ডে বিরল। অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৩ সালের ৫ জুলাই সর্বোচ্চ ৪০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছিল। গত বুধবার চট্টগ্রামে ৩৯৪ মিলিমিটার এবং শুক্রবার সাতক্ষীরায় ২২৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হওয়া প্রকৃতির অস্বাভাবিক আচরণেরই ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তন এবং এল নিনোর প্রভাবে এবারের বর্ষায় অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। এর ফলে স্বল্প সময়ে ব’\ন্যা ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রাজধানী ঢাকাতেও টানা বৃষ্টিতে জনজীবন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। শুক্রবার সকাল থেকে নিউমার্কেট, ধানমন্ডি, মিরপুর, মালিবাগ, শান্তিনগরসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক সড়কে হাঁটুপানি জমে যাওয়ায় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং তীব্র যানজটে নগরবাসীকে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। বিভিন্ন মার্কেটে পানি ঢুকে ব্যবসায়ীদেরও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
পাউবোর ব’\ন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান (Sardar Uday Raihan) জানিয়েছেন, আগামী ৪৮ ঘণ্টায় দেশের ব’\ন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে। তবে এরপর ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৩ জুলাই পর্যন্ত দেশের উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। বঙ্গোপসাগরে নতুন করে লঘুচাপ সৃষ্টির আশঙ্কা থাকায় চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে দেশের চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত এবং নদীবন্দরগুলোতে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক (Dr. Omar Faruk) বলেন, দেশের আট বিভাগেই বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। তবে সোমবার থেকে বৃষ্টির তীব্রতা কিছুটা কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
এই ভয়াবহ দুর্যোগ মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসনকে ২৪ ঘণ্টা আবহাওয়া ও নদ-নদীর পানির তথ্য হালনাগাদ রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি ঢলে বসবাসকারী মানুষকে দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নেওয়া এবং উদ্ধারকারী দলগুলোকে সর্বোচ্চ প্রস্তুত রাখার নির্দেশ দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
জনস্বাস্থ্য ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টানা বর্ষণ অব্যাহত থাকলে ব’\ন্যা পরিস্থিতির পাশাপাশি জলাবদ্ধতা, বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়বে। তাই দ্রুত ত্রাণ, নিরাপদ আশ্রয়, বিশুদ্ধ পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নজরদারি জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

