ফুটপাথে ঘুমন্ত শিশুকে তুলে নিয়ে ধ’\র্ষ’\ণ-হ’\ত্যা: দিল্লির গৃহহীন নারী ও কন্যাশিশুদের প্রতিটি রাতই আতঙ্কের

দিল্লি (Delhi)-র মেহরৌলি (Mehrauli) এলাকায় মেট্রো স্টেশনের কাছের ফুটপাথে শুয়ে ঘুমাচ্ছিল আনুমানিক দশ বছর বয়সী একটি মেয়ে। গত ২২ জুন ভোরে এক ট্যাক্সিচালক তাকে সেখান থেকে তুলে নিয়ে যায়। পরে শিশুটিকে ধ’\র্ষ’\ণ করে হ’\ত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়েটির লা’\শ গুরুগ্রাম-ফরিদাবাদ সীমান্তের কাছে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে গ্রে’\ফতার করেছে পুলিশ। এই ঘটনা আবারও ভারতের রাজধানীতে খোলা আকাশের নিচে বসবাস করা নাবালিকা ও নারীদের নিরাপত্তা নিয়ে ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে এনেছে।

জীবিকার সন্ধানে ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ দিল্লিতে আসেন। তাদের কেউ কেউ পরিবার নিয়ে স্থায়ী কিংবা অস্থায়ীভাবে থাকার একটি জায়গা খুঁজে পান। কিন্তু অনেকের ভাগ্যে মাথার ওপর সামান্য ছাদও জোটে না। বাধ্য হয়ে তাদের রাস্তার ধারে, ফুটপাথে কিংবা উন্মুক্ত কোনো স্থানে রাত কাটাতে হয়।

মাথার ওপর ছাদ ছাড়াই দিল্লির রাস্তায় ঠিক কত মানুষ বসবাস করছেন, তার নির্ভরযোগ্য সরকারি পরিসংখ্যান নেই। তবে গৃহহীন ব্যক্তিদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন শহরি অধিকার মঞ্চ (Shahri Adhikar Manch)-এর অনুমান, ২০২৪ সালে দিল্লিতে প্রায় তিন লাখ মানুষ গৃহহীন অবস্থায় ছিলেন। তাদের একটি বড় অংশ নারী। সময়ের সঙ্গে এই সংখ্যা আরও বাড়ছে বলেও মনে করছে সংগঠনটি।

যাদের ঘরই রাস্তা, তাদের প্রতিটি রাত শুরু হয় নতুন আশঙ্কা নিয়ে। কখনো বিরূপ আবহাওয়া ঘুম কেড়ে নেয়। কখনো দ্রুতগতির যানবাহন ফুটপাথে উঠে আসার ভয় তাড়া করে। তবে ছাদহীন নারী ও কিশোরীদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক শ্লী’\লতা’\হা’\নি এবং ধ’\র্ষ’\ণে’\র ঘটনা।

এই আতঙ্ক এতটাই প্রবল যে, অনেকেই রাতের পর রাত অর্ধেক ঘুমিয়ে আর অর্ধেক জেগে কাটান। এক রাত কিংবা দুই রাত নয়, এভাবেই তাদের জীবনের বছরের পর বছর পার হয়ে যায়। মেহরৌলির শিশুটির ঘটনার পর দিল্লির বিভিন্ন এলাকা ঘুরে রাস্তায় বসবাসকারী শিশু-কিশোরী ও নারীদের সেই প্রতিদিনের জীবনের খোঁজ নেওয়া হয়েছে।

‘ঘর থাকলে স্ত্রীকে কি খোলা জায়গায় রাখতাম?’

ঘটনাস্থলের কাছাকাছি লাডো সরাই এলাকার ফুটপাথে পৌঁছাতেই দেখা যায় সারি সারি মানুষ। নারীদের কেউ বেলুন বিক্রি করছেন, কেউ ফুল সাজাচ্ছেন, কেউ মূর্তি বানাচ্ছেন। কেউ আবার পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত।

ফুটপাথের ওপরই বিছিয়ে রাখা হয়েছে তোশক। লোহার বেড়ায় শুকাতে দেওয়া হয়েছে কাপড়। ছোট ছোট কৌটায় রাখা খাবার। তীব্র দাবদাহ থেকে সামান্য স্বস্তি পেতে কেউ কেউ পাশে স্ট্যান্ড ফ্যানও রেখেছেন। এই খোলা জায়গাই তাদের ঘর, দোকান, রান্নাঘর এবং রাতের শোবার স্থান।

সেখানেই বেলুন বিক্রি করছিলেন পূজা নামের এক নারী। তার ভাষায়, দিনের কষ্ট কোনোভাবে সামলে নেওয়া গেলেও রাত নামার পরই শুরু হয় আসল সমস্যা।

পূজা বলেন, ‘যতই রোদ হোক, বৃষ্টি হোক, দিন কোনোমতে কেটে যায়। আসল সমস্যা শুরু হয় রাতে। আশপাশ দিয়ে বহু লোক যায়। কেউ অশ্লীল কথা বলে, কেউ কাছে এসে বসে পড়ে। মাঝেমধ্যে অনেকে কাছাকাছি এসে শুয়ে পড়ে। মানা করলে আমাদের ধমক দিয়ে বলে—তুমি কি এই ফুটপাথ কিনে নিয়েছ?’

পূজার কাছেই বসেছিলেন তার স্বামী রোশন। স্ত্রীর নিরাপত্তার প্রসঙ্গ উঠতেই তার কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, ‘শ্লী’\লতা’\হা’\নি’\র বিষয় নিয়ে আর কী বলব! খালি কোনোমতে বেঁচে আছি। ঘর থাকলে কি আর আমার স্ত্রীকে এভাবে খোলা জায়গায় রাখতাম?’

রাতে স্ত্রী ও পরিবারের নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করেন—এমন প্রশ্নে রোশন জানান, বাস্তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো কোনো উপায় তাদের হাতে নেই। দিনের বেলায় কিছুটা ঘুমিয়ে নিয়ে রাতে জেগে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু শরীরেরও সীমা আছে।

রোশন বলেন, ‘কী করব? দিনের বেলায় অসম্পূর্ণ ঘুম পূরণ করি। কিন্তু রাত তো রাতই। চোখ লেগে যায়, আর তারপর ঠিক সেই একই ঘটনা ঘটে।’

রাজস্থানের ভিলওয়াড়ার বাসিন্দা পূজা ও রোশন প্রায় চার বছর আগে দিল্লিতে এসেছিলেন। তাদের একটি মেয়েও আছে। প্রথমে মেয়েকে সঙ্গে আনলেও ফুটপাথের পরিবেশ দেখে তাকে দিদিমার কাছে রেখে আসতে বাধ্য হন পূজা।

তিনি বলেন, ‘আমারও এক মেয়ে আছে। তাকে আমি সঙ্গে এনেছিলাম। কিন্তু এখানে এই সমস্ত দেখার পর ওকে ওর দিদিমার কাছে রেখে আসতে হয়েছে। সেখানে অন্তত মাথা গোঁজার একটা ঠাঁই তো আছে।’

‘চাষ বা অন্য কাজ থাকলে দিল্লি কেন আসব?’

নিজেদের এলাকায় ফিরে যাচ্ছেন না কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে রোশন বলেন, ফিরে যাওয়ার মতো জীবিকা সেখানে নেই বলেই তারা দিল্লির রাস্তায় পড়ে আছেন।

তার ভাষ্য, ‘যদি চাষবাস বা অন্য কোনো কাজ থাকত, তাহলে এখানে কেন আসব? আমরা চার বছর ধরে দিল্লির রাস্তায় বাস করছি। মাঝে একটা ঝুপড়ি বানানোর চেষ্টাও করেছিলাম, কিন্তু পুলিশ বারবার এসে ভেঙে দিয়ে যায়। তারা বলে, ঝুপড়ি বানাতে গিয়ে আমরা একদিন রাস্তাটাই দখল করে নেব।’

দুজন মিলে প্রতিদিন দুই থেকে তিনশ টাকা আয় করেন। সেই টাকার একটি অংশ দিয়ে আবার বিক্রির জন্য নতুন বেলুন কিনতে হয়। কিছু টাকা খাবারের পেছনে যায়। বাকি যা থাকে, তা মেয়ের কাছে পাঠানোর জন্য জমিয়ে রাখেন।

তাদের কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চাইলে রোশন মুখে কিছু বলেননি। তার তিক্ত হাসিই যেন প্রশ্নটির উত্তর হয়ে ওঠে।

একটি ট্র্যাফিক লাইটের কাছে মাসির সঙ্গে থাকে রশ্মি। নিরাপত্তার স্বার্থে তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। রাস্তায় উ’\ত্যক্ত করা কিংবা শ্লী’\লতা’\হা’\নি’\র ঘটনা তার কাছে এতটাই নিয়মিত হয়ে উঠেছে যে, এখন আর সেগুলোর হিসাব রাখে না সে।

রশ্মি বলে, ‘এখন আমি উ’\ত্যক্ত করার ঘটনার হিসেব রাখা বন্ধ করে দিয়েছি। এর আগে আমি কোনো এক পাশে ঘুমাতাম। কিন্তু বেশ কয়েকবার শ্লী’\লতা’\হা’\নি’\র ঘটনা ঘটার পর সব নারীরাই কম বয়সের মেয়েদের মাঝখানে রেখে ঘুমাতে শুরু করেন। একেবারে ছোট হলে মা তাকে বুকে আঁকড়ে ধরে ঘুমায়।’

তার অভিযোগ, ফুটপাথ থেকে বহু শিশু ঘুমন্ত অবস্থাতেই উধাও হয়ে গেছে। সারারাত পাহারা দেওয়ার চেষ্টা করলেও একসময় চোখ লেগে আসে। আর সেই কয়েক মুহূর্তেই ঘটে যেতে পারে ভয়াবহ কিছু।

রশ্মি বলে, ‘আপনি যতই চেষ্টা করুন না কেন, ঘুমিয়ে পড়লে কারও হুঁশ থাকে? কিছু না কিছু ঘটে যায়। অনেক মায়ের সন্তানই ঘুমের মধ্যে উধাও হয়ে যায়। তারা কান্নাকাটি করে। পুলিশের কাছে গেলেও ঠিকমতো বলতে পারে না। তারপর ফিরে এসে একইভাবে দিন গুজরান শুরু হয়।’

নারী অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন পিপল এগেইন্সট রেপস ইন ইন্ডিয়া (People Against Rapes in India)-র প্রতিষ্ঠাতা ও সমাজকর্মী ইয়োগিতা ভায়ানার দাবি, এই বিষয়ে সরকারি পর্যায়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ গবেষণা না থাকলেও রাস্তায় বসবাসকারী প্রতি ১০ জন মেয়ের মধ্যে নয়জনই কোনো না কোনোভাবে যৌ’\ন নি’\র্যা’\তনে’\র শিকার হয়।

তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে কোনো অফিশিয়াল স্টাডি না থাকলেও রাস্তায় বসবাসকারী ১০ জন মেয়ের মধ্যে নয়জনকেই যৌ’\ন নি’\র্যা’\তনে’\র শিকার হতে হয়। একবার, দুবার—তারপর বারবার হতে থাকা এই জাতীয় ঘটনা একসময় এতটাই সাধারণ হয়ে যায় যে, এগুলোকে তারা নিজেদের জীবনের অংশ ভাবতে শুরু করে। প্রতিবাদ করা বন্ধ করে দেয়। ঠিক এই কারণেই খুব কমসংখ্যক ঘটনার অভিযোগ দায়ের হয়।’

ভায়ানার মতে, মেহরৌলির ঘটনাটি চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল বলেই তা জনসমক্ষে এসেছে। কিন্তু গৃহহীন নারী ও শিশুদের সঙ্গে প্রতিদিনই কোনো না কোনো ঘটনা ঘটে, যার অধিকাংশই অজানা থেকে যায়।

তিনি বলেন, ‘মেহরৌলির ঘটনাটা মারাত্মক পর্যায়ের ছিল, তাই প্রকাশ্যে এসেছে। না হলে গৃহহীনদের সঙ্গে প্রতিদিনই কিছু না কিছু ঘটতে থাকে।’

প্রায় তিন বছর আগের একটি ঘটনার কথাও তুলে ধরেন ভায়ানা। তার কাছে সহায়তার জন্য এসেছিলেন এক নারী, যিনি নৃ’\শংস সংঘবদ্ধ ধ’\র্ষ’\ণে’\র শিকার হয়েছিলেন। তিন মাস তাকে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সেস বা এইমসে ভর্তি থাকতে হয়েছিল।

ভায়ানা বলেন, ‘প্রায় তিন বছর আগে আমার কাছে একজন নারীর মামলা এসেছিল। নৃ’\শংসভাবে সংঘবদ্ধ ধ’\র্ষ’\ণ করা হয়েছিল তাকে। তিন মাস এইমসে ভর্তি ছিলেন তিনি। সুস্থ হয়ে ওঠার পর আমরা তাকে নিরাপদ জায়গা ও কাজের ব্যবস্থা করেছি।’

শিশুদের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেন তিনি। বাবা-মায়ের পাশে ঘুমিয়ে থাকা শিশুকেও কখনো এমনভাবে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় যে, কেউ টের পান না।

তার ভাষ্য, ‘বাচ্চা মেয়েদের অবস্থা আরও খারাপ। বাবা-মা ঘুমাচ্ছেন, সেও পাশেই ঘুমাচ্ছে। কিন্তু তুলে নিয়ে যায়, টেরও পাওয়া যায় না। তবে এরা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না।’

গৃহহীনরা আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে অনীহা দেখান কেন, তারও ব্যাখ্যা দেন এই সমাজকর্মী। তিনি জানান, রাস্তায় পথচারীদের কাছ থেকে খাবার, পোশাক কিংবা কম্বল পাওয়া যায়। আশ্রয়কেন্দ্রে মাথার ওপর ছাদ থাকলেও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর সুযোগ অনেক সময় সীমিত।

ভায়ানা বলেন, ‘পথচারীরা এদের খাবার-দাবার দেয়, কম্বল দেয়। কিন্তু শেল্টারে তাদের মাথার ওপর শুধুমাত্র ছাদ আছে। এই কারণেই অনেকে বিকল্প থাকা সত্ত্বেও রাস্তায় থাকে। যতক্ষণ না চরম কিছু ঘটছে।’

মেহরৌলির ফুটপাথকেই নিজের ঘর বানিয়েছেন কৌশল নামের এক নারী। কথা বলার সময় তার হাতে অবসর ছিল না। তিনি তখন রান্না করছিলেন। রান্না শেষে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে সন্ধ্যায় ফুল বিক্রি করতে বের হবেন। তার মেয়েও বেলুন বিক্রি করবে।

কৌশল জানান, পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য আলাদা কাজ নির্ধারিত। সবাই কিছু না কিছু আয় না করলে খাবারের ব্যবস্থা করা সম্ভব হয় না।

তিনি বলেন, ‘পরিবারে যতজন সদস্য আছে, সবার কাজ বরাদ্দ করা আছে। তবেই খাবারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।’

কৌশলের ভয় শুধু মেয়েকে নিয়ে নয়, ছোট ছেলেকে নিয়েও। মেয়েকে পাশে নিয়ে ঘুমালে আশঙ্কা হয়, কেউ তার ছেলেকে তুলে নিয়ে যাবে। তাই রাতে জেগে থাকার জন্য দিনের বেলায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করেন।

তিনি বলেন, ‘মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে ঘুমালে ভয় হয়, যদি কেউ ছোট ছেলেকে নিয়ে চলে যায়। রাতে একটু সজাগ থাকার জন্য দিনে দুই থেকে তিন ঘণ্টা ঘুমিয়ে নিই।’

খোলা রাস্তায় চব্বিশ ঘণ্টা কাটানোর শারীরিক ও মানসিক ক্লান্তির কথাও তুলে ধরেন কৌশল। যানবাহনের শব্দ, মানুষের চিৎকার এবং পুলিশের লাঠির আতঙ্কের মধ্যে স্বাভাবিক ঘুম তাদের জীবনে প্রায় অসম্ভব।

কৌশল বলেন, ‘ভাবুন তো, ২৪ ঘণ্টাই আমাদের রাস্তাতে থাকতে হয়। গাড়ির আওয়াজ, লোকজনের আওয়াজ, পুলিশের লাঠি—এমন পরিস্থিতিতে কী করে ঘুম হবে? সারাদিন আমার চোখ এমন জ্বলতে থাকে যেন চোখে নুন পড়েছে। মাথা দপদপ করে। পেট হয়তো ভরা, কিন্তু ঘুম অর্ধেক। এইভাবে একদিন-দুদিন না, আপনাকে পুরো জীবন কাটাতে হবে।’

রান্নার মধ্যেই কৌশলের কাছে প্লাস্টিকের ইনডোর সুইমিং পুল দেখতে কয়েকজন ক্রেতা আসেন। তিনি জানান, একটি পুলে হাওয়া ভরতেই এক থেকে দেড় ঘণ্টা লেগে যায়। অথচ অনেক ক্রেতা এসে শুধু দেখে চলে যান।

আবার রাতে পুলের হাওয়া বের করে না রাখলে কেউ কেউ সূঁচ দিয়ে খোঁচা মেরে সেটি নষ্ট করে দেয়। কৌশলের কাছে এটি অন্যদের নিষ্ঠুর ও করুণ এক ধরনের মজা।

‘জঙ্গলের চেয়েও মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ঙ্কর’

কাছেই ত্রিপলের নিচে বাস করে আরেকটি পরিবার। তারা সেখানে গণেশ ও দুর্গার প্রতিমা তৈরি করে, আর রাতে ঘুমায় ফুটপাথে। পরিবারটির প্রধান মীরা জানান, তাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি রাজস্থানে। তবে রাজস্থানের কোথায় সেই বাড়ি, তা তিনি নিজেও জানেন না।

মধ্যবয়সী এই নারী বলেন, ‘আমি জানি না। দাদু থাকতেন হয়তো। আমার মা এখানে জন্মেছে। আমি এই ফুটপাতে জন্মেছি। আমার সন্তানরাও এখানে জন্মেছে।’

ত্রিপলের নিচে রাখা অসমাপ্ত প্রতিমাগুলো দেখিয়ে মীরা বলেন, সামনে উৎসবের মৌসুম আসছে। প্রতিদিন তারা তিনটি করে মূর্তি তৈরি করেন। কিন্তু দিল্লির প্রতিকূল আবহাওয়ায় মানুষের শরীরই যেখানে টেকে না, সেখানে মাটির প্রতিমা টিকিয়ে রাখাও কঠিন।

হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘মৌসুম আসছে। প্রতিদিন তিনটি করে মূর্তি তৈরি করি। দিল্লির এই মৌসুমে মানুষের হাড়-মাংস কিছুই ঠিক থাকে না, সেখানে মাটির তৈরি মূর্তি টিকবে কী করে? তাছাড়া পুলিশও মাঝেমধ্যে ত্রিপল সরিয়ে দেয়।’

মেহরৌলির শিশুটির ঘটনা সম্পর্কে জানেন মীরা। তার মতে, তরুণী মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানোর চেয়ে জঙ্গলে থাকা কখনো কখনো কম ভয়ঙ্কর মনে হয়।

তিনি বলেন, ‘জঙ্গলে থাকার চেয়ে তরুণী মেয়েকে নিয়ে রাস্তায় ঘুমানো বেশি ভয়ঙ্কর। জঙ্গলে একটা সিংহ আসবে, একটা সাপ আসবে। আবার নাও আসতে পারে। এলে এমন হতে পারে যে, তারা চুপচাপ চলে গেল। কিন্তু মানুষ এখানে আসবেই আসবে।’

মীরার ভাষায়, এমন কোনো রাত নেই যখন তাদের ঘুম ভাঙে না কিংবা কোনো না কোনো কারণে চিৎকার করতে হয় না। মাঝেমধ্যে পুলিশের কাছে অভিযোগ জানাতে গেলেও তাদের ঘরে গিয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, ‘এমন কোনো রাত নেই যখন আমরা জেগে উঠি না বা চিৎকার করি না। মাঝেমধ্যে আমরা পুলিশের কাছেও যাই। তারা বলে, যান ঘরে গিয়ে থাকুন। কিন্তু কোথায় বাড়ি ভাড়া নেব? বাড়ি ভাড়া তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা। আমরা এক মাসে এত টাকা আয় করি না।’

আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার অভিজ্ঞতাও সুখকর ছিল না মীরার। শীতের সময় কয়েকবার সেখানে গেলেও ভেতরের পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারেননি।

তিনি বলেন, ‘শীতের সময় আমি কয়েকবার আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও একটা অন্য পরিবেশ। লোকেরা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করতে থাকে। তাই সেখান থেকে ফিরে এসেছিলাম।’

‘যতটা সম্ভব সাবধানে থাকি’

১২ বছর বয়সী আভ্যাও একসময় আশ্রয়কেন্দ্রে থাকার চেষ্টা করেছিল। নিরাপত্তার কারণে তার নাম পরিবর্তন করা হয়েছে। নিজের অবস্থার কথা বলতে গিয়ে কিশোরীটির কণ্ঠে অসহায় মেনে নেওয়ার সুর শোনা যায়।

মৃদুস্বরে সে বলে, ‘হলেই বা কী করব। মেয়েদের জাত, এসব তো হবেই। যতটা সম্ভব সাবধানে থাকি। পালা করে ঘুমাই আমরা। একজন তিন ঘণ্টা ঘুমায়, অন্যজন পরের তিন ঘণ্টা। মোবাইলের দিকে তাকিয়ে রাত কোনোমতে কেটে যায়।’

১২ বছরের আভ্যা থেকে ৫০ বছর বয়সী কৌশল—বয়সের ব্যবধান থাকলেও তাদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই। তারা ঝলমলে রাজধানীর এমন এক অংশ, যাদের আড়ালে রাখা গেলেই কেবল দিল্লিকে তার বহুল প্রচারিত রূপে দেখা যায়।

মেহরৌলির ঘটনাটি নিয়ে ডিসিপি দক্ষিণ অনন্ত মিত্তল বলেন, ঘটনার খবর পাওয়ার পরপরই পুলিশ ব্যবস্থা নেয়। একাধিক দল গঠন করে তদন্ত শুরু করা হয়। শত শত সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে ধরা হয়।

তিনি বলেন, ‘আমরা ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ব্যবস্থা নিই। বেশ কয়েকটা টিম গঠন করা হয় এবং তদন্ত শুরু হয়। শত শত সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে প্রায় ছয় ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে ধরা হয় এবং এফআইআর দায়ের করা হয়। পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারকে কাউন্সেলিং করে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

গৃহহীন নারী ও শিশুদের সুরক্ষায় দিল্লি পুলিশ (Delhi Police)-এর উদ্যোগ সম্পর্কে ডিসিপি জানান, বিষয়টি নিয়ে একাধিক প্রশাসনিক বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করে। বিভিন্ন এলাকায় পুলিশের টহল বাড়ানো হচ্ছে এবং সন্দেহজনক গতিবিধির ওপর নজর রাখা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘গৃহহীনদের সুরক্ষার বিষয়টার জন্য একাধিক প্রশাসনিক বিভাগ একসঙ্গে কাজ করে। আমরা প্রতিটা এলাকায় টহল বাড়াচ্ছি এবং মানুষের ওপর নজর রাখছি। আতঙ্কিত না হয়ে জনগণ যেন পুলিশের পাশে আসে, আমরা সেই আশ্বাস দিচ্ছি।’

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি পেশায় ট্যাক্সিচালক। পুলিশের কাছে সে শিশুটিকে অপ’\হর’\ণ, ধ’\র্ষ’\ণ ও খু’\নে’\র কথা স্বীকার করেছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, ২৫ জুন অভিযুক্তকে আদালতে হাজির করা হলে দিল্লি পুলিশ তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানায়।

পুলিশের দাবি, ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়ার সময় অভিযুক্ত এক পুলিশ সদস্যের সরকারি রিভলবার ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে এবং গু’\লি চালায়। পাল্টা ব্যবস্থার সময় পুলিশের ছোড়া গু’\লি তার পায়ে লাগে। পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এর পাশাপাশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পুলিশের ওপর হা’\মলা চালানোর অভিযোগেও মামলা দায়ের করা হয়েছে।

প্রায় চার দশক ধরে গৃহহীন ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করছেন সমাজকর্মী ড. রাজেশ কুমার। তার মতে, গৃহহীনদের মধ্যে নারীরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। আর কন্যাশিশুদের দুর্ভোগ আরও চরম।

তিনি বলেন, ‘গৃহহীনদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে থাকেন নারীরা। এক্ষেত্রে বাচ্চা মেয়েরা চরম ভোগান্তির শিকার হয়। ঘুমের মধ্যেই তাদের তুলে নিয়ে যাওয়া হয় এবং ধ’\র্ষ’\ণ ও হ’\ত্যা’\র মতো অপরাধ ঘটে। মাঝেমধ্যে তাদের বিক্রিও করে দেওয়া হয়।’

ড. রাজেশের মতে, মেহরৌলির ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এমন ঘটনা বারবার ঘটলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযোগ দায়ের করা হয় না। অনেক বাবা-মা জানেন না, সন্তান নিখোঁজ হলে কিংবা কোনো অপরাধের শিকার হলে পুলিশের কাছে কীভাবে যেতে হবে।

তিনি বলেন, ‘মেহরৌলির ঘটনাটা বিচ্ছিন্ন নয়। এমনটা ঘটতেই থাকে, শুধুমাত্র অভিযোগ দায়ের করা হয় না। বাবা-মায়েরা জানেন না যে, কিছু ঘটলে কীভাবে পুলিশের কাছে যেতে হবে।’

রাস্তায় কোনো শিশুকে একা পাওয়া গেলে তাকে অবিলম্বে আশ্রয়কেন্দ্রে নিয়ে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির সামনে হাজির করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. রাজেশ বলেন, ‘যদি কোনো শিশু রাস্তায় একা থাকে, তবে তাকে অবিলম্বে শেল্টারে নিয়ে চাইল্ড ওয়েলফেয়ার কমিটির কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। দিল্লিতে গৃহহীনদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুযায়ী আশ্রয়কেন্দ্র কম। বিদ্যমান আশ্রয়কেন্দ্রগুলোর ক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন করা দরকার।’

দিল্লি আরবান শেল্টার ইমপ্রুভমেন্ট বোর্ড (Delhi Urban Shelter Improvement Board)-এর তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে প্রায় ২০০টি স্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে।

এসব আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ১৫৫টি পুরুষদের জন্য নির্ধারিত। পরিবারের জন্য রয়েছে ২০টি। অথচ নারীদের জন্য সংরক্ষিত আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা মাত্র ১৭টি।

দিল্লিতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা আসলে কত?

২০২৪ সালের আগস্টে টানা পাঁচ রাত ধরে গৃহহীন মানুষের গণনা চালায় শহরি অধিকার মঞ্চ। সেই সময় দিল্লির রাস্তায় দেড় লাখের বেশি মানুষকে বসবাস করতে দেখা যায়।

তবে অনেক এলাকায় প্রবেশের সুযোগ না পাওয়ায় সংগঠনটির ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা এর দ্বিগুণের কাছাকাছি। তাদের অনুমান অনুযায়ী, রাজধানীতে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা তিন লাখেরও বেশি।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গঠিত স্টেট লেভেল শেল্টার মনিটরিং কমিটিও শহরি অধিকার মঞ্চের এই গণনা ও অনুমানকে সমর্থন করেছে।

মেহরৌলির যে ফুটপাথ থেকে শিশুটিকে তুলে নিয়ে নৃ’\শংস নি’\র্যা’\তনে’\র অভিযোগ উঠেছিল, সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বসবাসকারী পরিবারগুলোকে ইতোমধ্যেই সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ফুটপাথটিতে এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সেখানে নেই তাদের বসবাসের কোনো চিহ্ন। আবার কীভাবে কিংবা কখন তাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেই প্রমাণও দৃশ্যমান নয়।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এএম