ভিসা চালু, তবু কলকাতামুখী নন বাংলাদেশিরা; ফাঁকা নিউ মার্কেট–মার্কুইস স্ট্রিট

দীর্ঘ বিরতির পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের (India) ভিসা পরিষেবা আবার চালু হয়েছে। এতে কলকাতার ব্যবসায়ী, হোটেল মালিক ও পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছিল। তাদের ধারণা ছিল, ভিসা কার্যক্রম স্বাভাবিক হলে বাংলাদেশি পর্যটকেরা আবার ফিরবেন এবং দীর্ঘদিন ধরে চলা ব্যবসায়িক স্থবিরতা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করবে। তবে ভিসা চালুর পরও বাস্তব চিত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।

বিশেষ করে কলকাতার (Kolkata) পরিচিত ও একসময়ের ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলোর দৃশ্য এখনো আগের মতোই নিরুত্তাপ। নিউ মার্কেট (New Market) ও মার্কুইস স্ট্রিট (Marquis Street) এলাকা জুলাই বিপ্লবের আগে বছরের প্রায় পুরো সময় বাংলাদেশি পর্যটকদের ভিড়ে সরগরম থাকত। কেনাকাটা, চিকিৎসা, ভ্রমণ কিংবা স্বল্পমেয়াদি অবস্থানের জন্য বাংলাদেশিদের কাছে এসব এলাকা ছিল অত্যন্ত পরিচিত গন্তব্য। কিন্তু এখনো সেখানকার বড় একটি অংশ ফাঁকা পড়ে আছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ভেবেছিলেন, ভিসা চালুর সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ক্রেতাদের আনাগোনা শুরু হবে। হোটেল মালিকেরাও আশা করেছিলেন, আবার কক্ষ বুকিং বাড়বে এবং দীর্ঘদিনের লোকসান কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা এখনো বাস্তবে রূপ নেয়নি। বাংলাদেশিদের এই অনাগ্রহের পেছনে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং বিকল্প ভ্রমণ গন্তব্যের প্রতি আগ্রহ—এই তিনটি বিষয় বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের বিভিন্ন মন্তব্যেও এই অনীহার কারণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় অনেকেই ভারত ভ্রমণ নিয়ে নিজেদের ক্ষোভ, অস্বস্তি ও আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের অধিকাংশ রাজ্যে বিজেপির (Bharatiya Janata Party) রাজনৈতিক প্রভাব এবং মুসলিমদের ওপর আ’\ক্রমণের বিভিন্ন খবরে বহু বাংলাদেশি নিজেদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

কাজী ইকবাল হোসেন নামের এক নেটিজেনের মতে, ভ্রমণের সময় ব্যাগ তল্লাশি করে গরুর মাংস খোঁজার মতো অবাঞ্ছিত ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা থাকলে নিরাপত্তার বিষয়টিই সবার আগে গুরুত্ব পাবে। তার বক্তব্যে স্পষ্ট, শুধু ভিসা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলেই পর্যটকেরা কোনো দেশে যেতে আগ্রহী হবেন না; সেখানে তারা কতটা নিরাপদ ও সম্মানিত বোধ করবেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

আমিন বাবু নামের আরেক ব্যক্তি মন্তব্য করেন, ভ্রমণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে পর্যটকেরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও আতিথেয়তার বিষয়ে নিশ্চিত হতে চান। কোনো গন্তব্যে গিয়ে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি, বৈরী আচরণ কিংবা অসম্মানের আশঙ্কা থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সেই দেশ বা শহরের প্রতি আগ্রহ কমে যায়।

ভারতের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিরূপ মন্তব্য ও আচরণও অনেক বাংলাদেশিকে মানসিকভাবে নিরুৎসাহিত করছে। রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রভাব সরাসরি পর্যটন খাতে পড়ছে কি না, তা পরিসংখ্যান দিয়ে নির্ধারণ করা কঠিন হলেও বাংলাদেশি ভ্রমণকারীদের মন্তব্যে তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্বের বিষয়টি স্পষ্ট। তাদের একটি বড় অংশ এখন শুধু সহজে ভিসা পাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন না; বরং নিরাপত্তা, সম্মান ও আন্তরিক আচরণকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।

এর পাশাপাশি বাংলাদেশিরা কলকাতাকেন্দ্রিক ভ্রমণের বিকল্পও খুঁজে নিতে শুরু করেছেন। প্রায় দুই বছর ভারতের ভিসা পরিষেবা বন্ধ থাকায় অনেকেই নতুন গন্তব্যের দিকে ঝুঁকেছেন। বিশেষ করে চীন (China) এখন বাংলাদেশিদের একটি অংশের কাছে ভ্রমণ ও ব্যবসার সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে উঠে এসেছে।

চীনে ভ্রমণের পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় সুযোগ থাকায় অনেক বাংলাদেশি দেশটির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। চীনা সরকার ও সাধারণ মানুষের আন্তরিকতাও তাদের মুগ্ধ করেছে বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনায় উঠে এসেছে। শুধু ডলার খরচ করে কলকাতায় কেনাকাটা করার বদলে চীনে গিয়ে ব্যবসার নতুন পথ তৈরি করা কিংবা ডলার আয়ের সুযোগ খোঁজাকে তারা তুলনামূলকভাবে বেশি লাভজনক ও সম্মানজনক মনে করছেন।

মামুন হাসান নামের এক নেটিজেন উল্লেখ করেন, টাকা খরচ করে বিদেশে ঘুরতে গেলে শুধু কলকাতাকেই কেন বেছে নিতে হবে—এমন প্রশ্ন এখন অনেক বাংলাদেশির মধ্যেই তৈরি হয়েছে। তার মতে, বাংলাদেশি পর্যটকেরা এখন মালদ্বীপ, থাইল্যান্ড, নেপাল, সিঙ্গাপুর কিংবা শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলোকে অনেক বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে কলকাতার ওপর থাকা একচেটিয়া নির্ভরতা ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে।

এই সার্বিক পরিস্থিতিতে কলকাতার ব্যবসায়ী এবং পর্যটনশিল্পের সঙ্গে যুক্ত মানুষেরা গভীর হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিউ মার্কেট এলাকার সাধারণ ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, তাদের ব্যবসার প্রায় ৭০ শতাংশই বাংলাদেশি ক্রেতাদের ওপর নির্ভরশীল। বাংলাদেশি ক্রেতাদের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় তাদের বিক্রি এখন তলানিতে এসে ঠেকেছে।

একসময় যেসব দোকানে বাংলাদেশি ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে ব্যস্ত থাকতে হতো, সেখানে এখন দীর্ঘ সময় ক্রেতার অপেক্ষায় বসে থাকতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। ভিসা চালুর খবরে তারা আশাবাদী হলেও পর্যটকের সংখ্যা প্রত্যাশা অনুযায়ী না বাড়ায় সেই আশা আবারও অনিশ্চয়তায় পরিণত হয়েছে।

হোটেল ব্যবসার অবস্থাও অত্যন্ত শোচনীয়। মার্কুইস স্ট্রিট ও সদর স্ট্রিটের একাধিক হোটেল মালিক জানিয়েছেন, আগে মাসের অধিকাংশ সময় তাদের সব কক্ষ বুকিং থাকত। বাংলাদেশি পর্যটকদের ওপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা এসব হোটেলে এখন দিনের পর দিন অর্ধেকের বেশি কক্ষ খালি পড়ে থাকছে। বর্তমান আয় দিয়ে কর্মীদের বেতন দেওয়াও অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।

ট্রাভেল কোম্পানি ও ট্যুর অপারেটরদের মতে, বাংলাদেশিদের মধ্যে ভারত ভ্রমণ নিয়ে একটি প্রচ্ছন্ন মানসিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই দূরত্ব শুধু ভিসা পরিষেবা চালু করলেই রাতারাতি দূর হবে না। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েন, নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং অন্য দেশগুলোতে ভ্রমণ ও ব্যবসার নতুন সুযোগ বাংলাদেশি পর্যটকদের সিদ্ধান্তে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে।

তাদের আশঙ্কা, পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুকূল না হলে এবং বাংলাদেশি পর্যটকদের মনে নিরাপত্তা, আতিথেয়তা ও সম্মানের অনুভূতি ফিরিয়ে আনা না গেলে কলকাতার পর্যটন ও বাংলাদেশি ক্রেতানির্ভর ব্যবসায়িক অর্থনীতি আরও গভীর সংকটের মুখে পড়তে পারে। ভিসা চালু হওয়া তাই আপাতত আশার বার্তা দিলেও নিউ মার্কেট, মার্কুইস স্ট্রিট ও আশপাশের এলাকার নীরবতা বলছে—পুরোনো সম্পর্কের উষ্ণতা ফিরতে এখনো অনেক পথ বাকি।